ঢাকায় ১২তম চাঁপাই উৎসব : গুণীজন সম্মাননা পেলেন হাসিব হোসেন

43

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার একমাত্র কমিউনিটি রেডিও ‘রেডিও মহানন্দা’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাসিব হোসেন গুণীজন সম্মাননা পেয়েছেন। রেডিও মহানন্দার প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা হিসেবে তাকে এ সম্মাননা দেয় ঢাকাস্থ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সমিতি।
আজ শুক্রবার ১২তম চাঁপাই উৎসবে হাসিব হোসেনের হাতে গুণীজন সম্মাননা স্মারক তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পানিস্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এমপি। হাসিব হোসেন ছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আরো ১১ কৃতী সন্তানকে গুণীজন সম্মাননা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে চারজনকে মরণোত্তর সম্মাননা দেয়া হয়।
তৃণমূল জনগোষ্ঠীর কাছে অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিৎ করে তাদের জীবন মানোন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলা রেডিও মহানন্দার এই পর্যন্ত আসতে মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জের। সব ধরনের প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে আগামীর দিকে। আর এসব সম্ভব হয়েছে যে মানুষটির জন্য তিনি হলেনÑ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিব হোসেন, রেডিও মহানন্দা প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা।
২০০৮ সালে সরকারের কাছে রেডিওর জন্য আবেদন এবং ২০১১ সালের ২৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু জেলার একমাত্র কমিউনিটি রেডিও ‘রেডিও মহানন্দা’র। এরই মধ্যে রেডিও মহানন্দা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই সময়ে মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডসহ ১৫টির মতো অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। এছাড়া ২০২১ সালে বাংলাদেশের একমাত্র ব্রডকাস্ট মিডিয়া হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মনোনীত হয়েছিল।
কমিউনিটি রেডিও ‘রেডিও মহানন্দা’র পথচলার শুরুতে প্রয়াসের নির্বাহী পরিচালক হাসিব হোসেনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় জাপান সরকার। তৎকালীন ঢাকাস্থ জাপানি রাষ্ট্রদূত মি. তামোতসু শিনোসুকার সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে সাক্ষাৎ করলে জাপান সহযোগিতার নিদর্শনস্বরূপ রেডিওর যন্ত্রপাতি প্রদানসহ ইনস্টলেশন করে দেয়। শুধু তাই নয়, রেডিও মহানন্দার কার্যক্রমে সহায়তা করার জন্য জাপান এরিকো আন্দো নামে একজনকে দুই বছরের জন্য ভলেন্টিয়ার হিসেবে প্রেরণ করে।
আমেরিকার তৎকালীন ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূত মি. ড্যান মজিনা ও তার স্ত্রী এবং সুইজারল্যান্ড অ্যাম্বাসির অ্যাম্বাসেডর মি. রেনে হলস্টেন রেডিও মহানন্দা পরিদর্শন করে গেছেন। এছাড়া আমেরিকান সরকারের খরচে হাসিব হোসেন আমিরকার ১০টি শহরে সিএনএন, ভয়েস অব আমেরিকাসহ প্রায় ২০টি এবং কমনওয়েলথ অব লার্নিংয়ের আওতায় ভারতের কলকাতা, বেঙ্গালুরু, দিল্লি, গুরগাঁও, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশের ১০টি কমিউনিটি রেডিও স্টেশন পরিদর্শন করেছেন। ইন্দোনেশিয়া ও নেপালে অনুষ্ঠিত কমিউনিটি রেডিওর ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন সম্মেলনে যোগদান করেছেন এবং সে দেশ দুটির বেশ কয়টি কমিউনিটি রেডিও স্টেশনও পরিদর্শন করা হয়েছে তাঁর।
বহু গুণে গুণান্বিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই কৃতী মানুষটির জন্ম ১৯৬৮ সালে, সদর উপজেলার কৃষ্ণগোবিন্দপুরে নানা বাড়িতে। বাবা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বেলেপুকুরের অধিবাসী মরহুম আনসার হোসেন ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার ব্যবসায়ী। তিন ভাইয়ের মধ্যে হাসিব হোসেন মেজ। বড়ভাই রাজিব হোসেন প্রকৌশলী। ছোটভাই নকীব হোসেন মারা গেছেন। দুই সন্তানের জনক হাসিব হোসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন। সহধর্মিণী আলেয়া ফেরদৌসও একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর। তিনি রেডিও মহানন্দার স্টেশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। ছোট ছেলে এবার এসএসসি পাস করেছে। বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগে অধ্যয়নরত। হাসিব হোসেন এক যুগ ধরে অধ্যাপনাও করেছেন জেলার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপঠী শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজে।
রেডিও মহানন্দা ছাড়াও সংস্কৃতিমনা মানুষ হাসিব হোসেনের আরো পরিচয় রয়েছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মাধ্যমে আনন্দময় পরিবেশে লোকশিক্ষা প্রদান করার লক্ষে গড়ে তুলেছেন ‘প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট (পিএফটিআই)’। লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্য ধারণ, সংরক্ষণ, উন্নয়ন, গবেষণা ও এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে কাজ করছে সংগঠনটি। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের লোকজ সংস্কৃতি দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতেও কাজ করছে প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট। গম্ভীরা নিয়ে ইউনেস্কোর সঙ্গেও কাজ করেছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই এখানে শিল্পচর্চা ও এর বিকাশে জীবনধারণ করে চলেছেন।
স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে অর্থনীতির চাকা ঠিক থাকবেÑ এই মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষটি স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি আলাদাভাবে প্রয়াস হেলথ কেয়ারও গড়েছেন। এছাড়া সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে ৭ বছর ধরে দৈনিক গৌড় বাংলার নিয়মিত প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছেন।
হাসিব হোসেনের বড় পরিচয় উন্নয়ন সংস্থা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা তিনি। যে প্রতিষ্ঠানে এখন ৭ শতাধিকেরও অধিক মানুষ কর্মরত রয়েছেন। বিশাল এ কর্মীবাহিনী দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ১০ লাখ মানুষকে নানান সেবা দিয়ে চলেছে। শুধু তাই নয়, তাঁর প্রয়াসের মাধ্যমে অনেক দরিদ্র মানুষ স্বাবলম্বী হয়েছেন, কেউ হয়েছেন উদ্যোক্তা। ভিক্ষুকদেরও পুনর্বাসন করা হয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহায়তায়।
১৯৮৮ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও অসহায় মানুষদের সাহায্য করার সময়ই প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন হাসিব হোসেন। সেই সময় তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এরপর ১৯৯৩ সালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন ‘প্রয়াস’-এর। মায়ের দেয়া ২ হাজার টাকাকে পুঁজি করে সামাজিক উন্নয়নের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাও মাত্র তিনজন কর্মী নিয়ে। যাদের প্রথমে বেতন দেয়া হয়েছিল মাত্র ১৫০ টাকা। শুরুতে নিজেই সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে স্যান্ডেলের শুকতলা ক্ষইয়েছেন। তবু দমে যাননি কর্মোদ্যমী প্রয়াসের নির্বাহী পরিচালক এই মানুষটি।