গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

155

sonatola-guccho-gram-1সরকার ভূমিহীন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠির আবাসনের লক্ষ্যে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পটি আরো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ২৪০টি গুচ্ছগ্রামের জায়গায় এখন আড়াই হাজার গুচ্ছগ্রাম করা হবে। সেজন্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রকল্পের পরিসর বাড়ানো হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে তিন পার্বত্য জেলার বাইরে ভূমি মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। পরিকল্পনা কমিশন ও ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য সবার জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমে ১০ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসন করার কথা থাকলেও বর্তমানে তা ৫০ হাজার নির্ধারণ করা হয়েছে। মূলত সরকারের খাসজমিতেই ওসব পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের সাফল্যের পর গুচ্ছগ্রাম ২য় পর্যায় (ক্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যাবিলিটেশন) শিরোনামে ওই প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। সেজন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৫৮ কোটি টাকা। ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য আবাসনের নির্বাচানী অঙ্গীকার  পূরণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ওই প্রকল্পে ভূমিহীন পরিবার ও গুচ্ছগ্রামের সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেন। সেই প্রেক্ষিতে ৬৮৪ কোটি টাকা প্রাক্কলতি ব্যয় যুক্ত করে প্রকল্পের ১ম সংশোধনীতে সম্প্রতি একনেক অনুমোদন দিয়েছে।
সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদে দারিদ্র নিরসন কর্মসূচীর আওতায় ২০০৯ সালে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। জুন ২০০৯ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত সরকার গুচ্ছগ্রাম (ক্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্ট) প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে দেশের ৭টি বিভাগের ৫৩টি জেলার ১৩১টি উপজেলায় ২৫৩টি গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করেছে। ওসব প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ হাজার ৭০৩টি ভূমিহীন, গৃহহীন, ঠিকানাবিহীন ও নদীভাঙনকবলিত পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের শুরু থেকেই নিঃস্ব পরিবারগুলোর কর্মক্ষম সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বিআরডিবি। দারিদ্র্য বিমোচনে তা ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি প্রথম পর্যায়ে স্থাপিত প্রতিটি গুচ্ছগ্রামেই পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম, প্রাথমিক শিক্ষার জন্য স্কুলের ব্যবস্থা, প্রাথমিক এবং প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ও সামাজিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালু রয়েছে। একই সাথে ভূমিহীন ও দরিদ্র পরিবারের ডেটাবেজ তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। সেজন্য মন্ত্রণালয় থেকে দেশের ৬০ জেলার জেলা প্রশাসককে ওসব পরিবারের সদস্যদের নাম-পরিচয়সহ বিভিন্ন তথ্যের সফট কপি পাঠাতে বলা হয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের সার্বিক লক্ষ্য হলো জলবায়ু দুর্গত ভূমিহীন পরিবারকে সরকারি খাস জমিতে পুনর্বাসন করা। সেজন্য নির্মিত ইকোভিলেজে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের নামে এবং বিধবাদের ক্ষেত্রে একক নামে বসত-ভিটার কবুলিয়াত প্রদান করা হয়। তাতে মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানার পাশাপাশি ৪ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত জমির নিষ্ককণ্টক মালিকানা, সম্মানের সাথে জীবিকা নির্বাহ আর সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি হয়। প্রকল্পের আরেকটি লক্ষ্য হলো- মানব সম্পদ উন্নয়নে পুনর্বাসিত পরিবারসমূহের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণসহ আয়বর্ধক কর্মকা- পরিচালনার মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সাধন করা। যা দেশের দারিদ্র্য নিরসনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। সেজন্যই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডসহ (বিআরডিবি) সরকারের একাধিক সংস্থা সরাসরি গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের কর্মকা-ের সাথে যুক্ত। এদিকে নির্মিত গুচ্ছগ্রামের প্রতিটি পরিবারের জন্য ৩০০ বর্গফুট ফ্লোর স্পেস বিশিষ্ট আরসিসি পিলারসহ দুইকক্ষ বিশিষ্ট ঘর এবং ৫ রিং বিশিষ্ট স্যানিটারি ল্যাট্রিন নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া পুনর্বাসিত প্রতিটি পরিবারকে ১টি করে মোট ৫০ হাজার উন্নত চুলা সরবরাহ করা হবে। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় হবে বসতভিটা উঁচুকরণ, পুকুর খনন, পুনঃখনন, সংযোগ রাস্তা ইত্যাদি নির্মাণ। নিরাপদ সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে স্থাপন করা হবে বিভিন্ন প্রকারের ১০ হাজার গভীর-অগভীর নলকূপ/রিংওয়েল/পন্ডস্যান্ড ফিল্টার ইত্যাদি। তার বাইরে উন্নত জীবনমান সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে গুচ্ছগ্রামমগুলোতে নির্মাণ করা হবে ৩৪০টি মাল্টিপারপাস হল, ৩৩৭টি গোসলখানা এবং ২৫০টি ঘাটলা। প্রাথমিকভাবে ৩০০ গুচ্ছগ্রামবাসী বিদ্যুত সরবারহ সুবিধা পাবে। অন্যদিকে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প সম্পর্কে ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পর্যায়ক্রমে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। গৃহহীনদের ঘর তৈরির যতো টাকাই লাগুক সরকার তা দেবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের বড় বাধা হলো খাস জমি খুঁজে বের করা। যদিও দেশে পর্যাপ্ত খাস জমি রয়েছে। কিন্তু গৃহহীন ও ভূমিহীনের জন্য জায়গা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এমন অজুহাত দেখানো যাবে না। সংশ্লিষ্ট কেউ খাস জমির সঠিক তথ্য দিতে গড়িমসি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।