গাইবান্ধায় সাঁওতালদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা

68

gগাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ আখ খামারের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সাঁওতালদের ওপর হামলা, লুটপাট ও ঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। গত বুধবার রাত ১১টার দিকে ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের পক্ষে মামলাটি করেন স্বপন মুরমু। মামলা দায়েরের পর পরই থানা পুলিশ অভিযানে নামে। হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এরই মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁরা হলেন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমার ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ গ্রামের আবদুর রশিদ, শাহনেওয়াজ, বাদশা, চয়ন মিয়া ও সাগর মিয়া। এদিকে, সংঘর্ষ-লুটপাটের ১১ দিন পর সাঁওতালদের পক্ষ থেকে করা মামলাটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে সাঁওতালদের ভূমি উদ্ধার আন্দোলন ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনের দুই নেতা। তারা বলছেন, এ মামলা ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে করা হয়নি। মামলার পর থেকে বাদীর কোনো খোঁজও তারা পাননি। গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত কুমার সরকার জানান, উপজেলার মুয়ালীপাড়া গ্রামের সমেস মুরমুর ছেলে স্বপন মুরমু গত বুধবার রাতে অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ থেকে ছয়শ জনকে আসামি করে এই মামলা করেন। সাঁওতালদের ওপর হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও গুলি করে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে মামলার এজাহারে। কিন্তু আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলছেন, এ মামলা ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ করেনি। পুলিশ অতি উৎসাহী হয়ে মূল ঘটনা আড়াল করে দোষীদের বাঁচাতে ক্ষতিগ্রস্ত মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া গ্রামের বাইরে অন্য এক গ্রামের আদিবাসীকে ডেকে এনে তাদের মনমতো মামলা দায়ের করেছে। এ ঘটনায় আলাদা মামলা করবেন বলে রবীন্দ্রনাথ সরেন জানান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, মামলা কে করেছে তা আমরা জানি না। আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত কেউ নয়। এদিকে মামলা দায়েরের পর রাতেই অভিযান চালিয়ে পাঁচ জনকে আটক করে গতকাল বৃহস্পতিবার গোবিন্দগঞ্জ আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানান ওসি। এই পাঁচজন হলেন- উপজেলা চক রহিমপুর গ্রামের মনির উদ্দিনের ছেলে মানিক মিয়া (২৬), হোসেন আলীর ছেলে বাদশা মিয়া (৫০), তরফ কামাল গ্রামের ওয়াহেদ বাবুর ছেলে চয়ন মিয়া (২৫), সাহেবগঞ্জ গ্রামের আব্দুল জোব্বারের ছেলে আব্দুর রশিদ (৬০) ও আসাদুজ্জামানের ছেলে শাহ নেওয়াজ (৩৮)। সাঁওতাল ও বাঙালিদের ১৮টি গ্রামের ১ হাজার ৮৪০ দশমিক ৩০ একর জমি ১৯৬২ সালে অধিগ্রহণ করে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ আখ চাষের জন্য সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার গড়ে তুলেছিল। সেই জমি ইজারা দিয়ে ধান ও তামাক চাষ করে অধিগ্রহণের চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ তুলে তার দখল ফিরে পেতে আন্দোলনে নামে সাঁওতালরা। এরপর সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মে বিরোধপূর্ণ চিনিকলের জন্য অধিগ্রহণ করা ওই জমিতে কয়েকশ ঘর তুলে সাঁওতালরা বসবাস শুরু করেন। গত ৬ নভেম্বর চিনিকল কর্তৃপক্ষ জমি উদ্ধার করতে গেলে সংঘর্ষ বাঁধে। সংঘর্ষের সময় সাঁওতালদের বাড়িঘর ও ফসলের ক্ষেতে লুটপাট হয়। একচালা ঘরগুলো পুড়িয়ে দেওয়ার পর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ট্রাক্টর দিয়ে মাটি সমান করে দেয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি চালায়। ওই ঘটনায় নিহত হন তিন সাঁওতাল, আহত হন অনেকে। ওই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে পাঁচটি মামলা করা হলেও সাঁওতালদের মামলা নেওয়া হচ্ছে না বলে আন্দোলনের নেতারা অভিযোগ করে আসছিলেন। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মঙ্গলবার রাতে দলের ধানমন্ডির কার্যালয়ে সাঁওতালদের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে ‘অনানুষ্ঠানিক আলোচনা’ করেন। রবীন্দ্রনাথ সরেন ও ফিলিমন বাস্কে দুজনেই সেখানে ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমাদের আশ্বাস দেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে একটি সম্মানজনক সমাধান আমরা পাব। সাঁওতালরা মামলা করতে পারছেন না জানানোর পর ওবায়দুল কাদের ওখানে বসেই এসপিকে ফোন করে মামলা নিতে বলেন। তিনি বলেন, আশ্বাস পাওয়ার পর সাঁওতালদের পক্ষে মামলা করার প্রস্তুতির মধ্েযই পুলিশ গত বুধবার রাতে একটি মামলা হওয়ার খবর দেয়। তার ধারণা, এটা ‘দূরভিসন্ধিমূলক’। অভিযোগ ‘দুর্বল করে দিতে’ হয়ত বিষয়টি ‘সাজানো’ হয়েছে। গত ৬ নভেম্বরের সংঘর্ষের ঘটনায় সাঁওতালদের ওপর কোন কর্তৃত্ববলে পুলিশ গুলি চালিয়েছে, তা জানতে চেয়ে রিট করা হয়েছে। গত বুধবার দুপুরে তিন সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), ল্যান্ড রিফর্ম ডেভেলপমেন্ট ও ব্রতী সমাজ সংস্থার পক্ষ থেকে হাইকোর্টে এ রিট করা হয়। রিটে সাঁওতালদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা না দেওয়া এবং তাদের হয়রানি না করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি, গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) রিটে বিবাদী করা হয়েছে।