গল্প আমার রেডিও এবং রেডিও মহানন্দার সাথে পথ চলা

205

DSC_0043

ছোট্ট কথায় বলছি শোনো,
এ নয় নিছক কল্পনা
বলছি সবই সত্যি কথা,
মোটেই তা গল্প না।
খুব ছোট বেলা থেকে বাবার হাত ধরে (ক্লাস ফোর) রেডিও শোনা শুরু করি। এই বুঝি ঘন্টা বাজছে কৈ রে খোকা শুরু হলো বাংলা। সেই থেকে রেডিওর প্রতি ভালোলাগাটা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে। আর ভালোলাগা থেকে ভালোবাসায় পূর্ণতা পেতে সময় লাগেনি বেশি। সময়ের কাঁটার সাথে সাথে আমিও সামনের দিকে অগ্রসর হতে চেষ্টা করি ব্যর্থতায় পিছ পা না হয়ে। জীবন নাটকের চেয়েও নাটকিয় বলছি কেন? বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান শুনে আমার ভিশন ভাবে ভাবনা শক্তি নাড়া দিতো, তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বেতারের বাণিজ্যিক কার্যক্রম এর অনুষ্ঠান এবং বাংলাদেশ বেতারের আঞ্চলিক কেন্দ্রের অনুষ্ঠান আমার শিক্ষার কারিগর স্বরূপ। বিশেষ করে রাজশাহী বেতারের কথা না বললেই নয়। স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে সবাই যখন খেলায় ব্যস্ত আমার হাত তখন রেডিওর নবে। অনুষ্ঠান শুনছি দিন গুলো ভালোই যাচ্ছে, কিন্তু সকল পূর্ণতার মাঝেও অপূর্ণতা, শূন্যতা, ব্যাকুলতা, গ্রাস করেছে আমায়। আমি অবুঝ বালক, নিজেকে অবুঝের মতোই জানতে চাইলাম, অবুঝের বুঝ বড়ই কঠিন – শুধু মাত্র রেডিও শুনলে হবেনা লিখতে হবে চিঠি। ২০০৮ সালে বন্ধুর সহযোগীতায় আমার লেখা চিঠি প্রচার হলো, প্রথম চিঠির উত্তর পেয়ে রেডিওকে জীবন চলার শিকড় থেকে শিখরে নিয়ে আসলাম। আগেই বলেছি জীবন নাটকের চেয়েও নাটকীয়, এখানেও থেমে থাকতে পারলাম না, ইচ্ছে শক্তির আরো কিছু পাওয়ার আকাঙ্খা থেকেই যায়। দেশের রেডিওগুলোর পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল বাংলা রেডিওর প্রতি দৃষ্টি পড়লো, হাটি হাটি পা পা করে পিছনের কথা স্বরণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। হেরে যাবার পাত্র নই আমি, অদম্য সাহস আর নিরলস প্রচেষ্টায় ইন্টারন্যাশনাল সকল বাংলা রেডিও, হিন্দি ও ইংরেজি অনুষ্ঠান শোনা শুরু করি। তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য: বাংলা, ডয়চে ভেলে (বর্তমানে বন্ধ), ওয়ার্ল্ড রেডিও জাপান (এনএইচকে), রেডিও ভেরিতাশ এশিয়া, চাইনা রেডিও ইন্টারন্যাশনাল, এডভানস্টিক ওয়ার্ল্ড রেডিও, রেডিও তেহরান, রেডিও কাইরো, রেডিও আশার বাণী, রেডিও তাইওয়ান, রেডিও প্যালেস্টাইন, ফ্যামিলি রেডিও, ভয়েস অফ আমেরিকা, রেডিও সৌদি আরব, অলইন্ডিয়া রেডিও, রেডিও মিচ্চিন, আকাশ বাণী কলকাতা, মুর্শিদাবাদ ইত্যাদি শুধু মাত্র অনুষ্ঠান শুনেছি তার মধ্যেই সিমাবদ্ধ নয়- চিঠিও লিখেছি এমন কি এখনো তা অবিরাম চলমান। চিঠি লিখে সবার কাছে প্রিয়তা লাভ করি। রাত শেষ না হতেই সূর্যের আগেই প্রশংসা পত্র এবং নানান পুরস্কার দরজায় করাঘাত করতো। সবার প্রশংসা ও ভালোবাসাকে সঙ্গী করে দেশে বিদেশে পেলাম নাম না জানা হাজারো বন্ধু বান্ধব, কথা হয়েছে ফোনে, কারো কারো সাথে দেখাও হয়েছে, হয়েছে আত্মীয়তা, এ যেন এক সেতু বন্ধনে আবদ্ধ স্পন্দন। সবকিছু যখন ঠিকঠাক জীবনের মোড় বদলে গিয়ে জীবন নাটকের এক চরম বাস্তবতা ছুয়ে ফেললো। আমার জীবনের সবটুকু অংশ জুড়ে ‘মা’ আজ ফটোগ্রাফি কবিতার মতো চার দেয়ালের আবদ্ধ ফ্রেমে বন্দি, চিরনিদ্রায় শায়িতো এবং শত মাইল দূরে বাবার ভালোবাসা পাওয়াটা গগণ চুম্বির মতোই। শত কষ্ট, বিরহ তন্দ্রা, নিরীহতা, নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয় এবং রেডিও শ্রোতাদের প্রতিযোগিতার কারণে রেডিওতে চিঠি লেখা বাদ দিয়ে দিলাম, কিন্তু রেডিও শোনা বাদ দেইনি। রেডিও উপস্থাপকদের সেই চিরচেনা কণ্ঠগুলো আজও প্রাণ ছুঁয়ে যায়।
না বলে পারলাম না, রেডিও মহানন্দা যেভাবে বদলে দিয়েছে আমার জীবন, বাংলাদেশ বেতারের কোন এক অনুষ্ঠানে শুনতে পায় বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিওর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকেও বেছে নেওয়া হয়েছে। এ কথা শুনে আমি গর্বিত হলাম এবং রেডিওর প্রতি না পাওয়া ভালোবাসা অবহেলায় পড়ে থাকা দরদ উঁপচে পড়লো। আজ মনে হচ্ছে বন্দি কারাবাস হতে মুক্ত আমি। অনেক খোঁজখবর নেবার পর জানতে পারি প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির ব্যবস্থাপনায় ও মো. হাসিব হোসেন ভাইয়ার অক্লান্ত পরিশ্রমে “জীবনের কথা জীবনের সুর”কে সাথে নিয়ে রেডিও মহানন্দা পথ চলা শুরু করে। আর জাপান সরকারের সহায়তায় এর যন্ত্রাংশ স্থাপিত হয়েছে। রেডিও মহানন্দা জন্মলগ্ন থেকে শুনে আসছি, সংগীতের তালে তালে শুরু হলো এসএমএস লেখা আর এভাবেই কাটলো আমার দুটি বছর। ঢং ঢং ঘন্টার শব্দ বাজছে, ঘড়িতে নয় – তবে আমার মনে, বিদায়ী ঘন্টা। যখনি শুনলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছেড়ে চলে যেতে হবে তখন আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি নিজের অজান্তেই দু-চোখের সিমা রেখায় স্বপ্নগুলো গলে গিয়ে নিঃশব্দে অশ্রু ফোটা গাল ছুঁয়ে ঝরে পড়ল। অবশেষে জন্ম স্থান ছেড়ে লেখাপডা ও কর্ম ব্যস্ততার কারণে চলেই গেলাম ঢাকায়। রেডিওর প্রতি ভালোবাসা এতোটায় ছিলো যাবার সময় রেডিওকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়, শুরু হলো ঢাকায় বসবাস। এতো কোলাহলের মাঝেও যেন আমার হƒদয়ের মর্মতলে শূন্যতা জায়গা করে নিয়েছে, কিসের এতো শূন্যতা? রেডিও মহানন্দা শোনার আকাঙ্খা আরো বাড়ছে কিন্তু স্বাদ এবং সাধ্যের মিল না থাকায় অনলাইনে তা শোনা হয়ে উঠেনি। শূন্যতা বুকে নিয়ে কাটলো আরো একটি বছর। কিছু পেয়ে হারিয়ে ফেলা এবং তা পুনরায় ফিরে পাওয়ার মধ্যে আনন্দটা হƒদয়ের পরতে পরতে ভালোবাসাটা প্রতিফলিত হয় আমি যখন প্রতিনিয়ত সাফল্যের দিকে অগ্রসর – ঠিক তখনি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে জানতে পারি রেডিও মহানন্দা মোবাইল এপ্লিকেশন তৈরি করেছে এবং তা আমি সংগ্রহ করে রেডিও মহানন্দা আবারো শোনা শুরু করি। বাইরে থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে জানতে পারছি- এখানকার খবরা-খবর পাচ্ছি আরএম এর সংবাদভিত্তিক আয়োজন আজকের চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাধ্যমে, এটাকি আমার পাওয়া নয় ? আমার সংস্কৃতি – আমার গর্ব, আধুনিক সমাজ সভ্যতায় মিশ্রিত ভালোবাসা, ঘৃণার রং পাত্র, অচেনা শহরে যখন ইট পাথরের চার দেয়ালে যখন আমি বন্দি। আমার মন শতকষ্ট বুকে নিয়ে ডুকরে কাঁদছিল তখনই সঙ্গী হিসেবে অলাইনের কল্যাণে সূদুরে বসে পেয়েছি ‘গামছা মাথল’ (গম্ভিরা গানের অনুষ্ঠান) ও ‘লগড়্যা পাঁচ ফড়ন’ কে। দেশের প্রিন্ট মিডিযাগুলো যখন পর্দার ভিতরে বেপর্দায় বেহাল নাজেহাল অবস্থা, অন্য দিকে বাণিজ্যিক রেডিওগুলো নিজেদের ইনকামে ব্যস্ত তখন রেডিও মহানন্দা সর্বদা কমিউনিটির মানুষদের পাশে থেকে উপকার করে চলছে। উদাহরণ স্বরূপ ‘ভাল শিখন সংলাপ’। রেডিও মহানন্দার সবগুলো অনুষ্ঠানে শিক্ষণীয় বিষয় উপস্থাপন করা হয় তাইতো এতো ভালোলাগে শুনতে। আজ রেডিও মহানন্দা পাঁচে পা (৫ম বছরে) দিলো, ফেলে আশা দিনগুলিতে রেডিও মহানন্দার কর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া আদর ¯েœহ প্রশংসা ভালোবাসা বিশেষ করে মো. হাসিব হোসেন ভাইয়ার বুকে টেনে নেওয়ার মতো কথার ঝুড়ি আমার পথ চলাকে আনন্দ দেয়। রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম এর প্রচার তরঙ্গের মাধ্যমে সংগীতের সুর যখন আমার কানে আলতো করে ছুঁয়ে যায় তখন মনে এক অনন্য অসাধারণ ভালোলাগার সৃষ্টি হয়, যে ভালোলাগার কোন পরিসীমা নেই, যে ভালোলাগার কোনো সমাপ্তি নেই, যে ভালোলাগা শুধু ভালোবাসা শেখায়, আর সে ভালোবাসা আমার জীবনে সাত রঙে রঙ্গিন হয়ে দক্ষিণা বাতাসের সাথে মিসে যায়, সে ভালোবাসা আমারকে আমার মতো করে চলতে শেখায়, যার শব্দ নেই। পরিশেষে সবার উদ্দেশ্যে একটা কথা বলার আছে, রেডিও মহানন্দা নিয়মিত নিজে শুনুন অন্যকে শুনতে উৎসাহিত করুণ আর শিতার্থ মানুষের পাশে দাঁড়ায়। যাবার বেলায় রেডিও মহানন্দার কাছে চাওয়া টুকু আবেগি মনের ভাষার প্রকাশ করলাম,
রেডিও মহানন্দা বেশি কিছু না,
তুমি আমার মধ্য রাতের অকারণ কান্নার কারণ হয়ো,
টলমল করতে থাকা দু ফোঁটা অশ্রু জল হয়ে আমার চোখের কোণে চুপটি করে বসে থেকো,
তারপর তোমাকে পেয়ে যাবার সবটুকু আনন্দ,
আর আমাকে হারিয়ে ফেলার সবটুকু ভয়,
ঔ অশ্রু ফোটায় জমা রেখে নিঃশব্দে গাল ছুঁয়ে নেমে যেও
বাধা দিবনা একদম বাধা দিবনা।

মোহা. নাসিম উদ্দিন
ডাইন্যামিক ইন্টারন্যাশনাল ডিএক্স রেডিও ক্লাব
গ্রাম: খড়কপুর, পোস্ট: মোবারকপুর
থানা: শিবগঞ্জ, জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ
মোবাইল: ০১৭৬৫ ৭১৭৮৭৬