গম্ভীরা খ্যাত নানা কুতুবুলের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

11

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরার নানা হিসেবে খ্যাত কুতুবুল আলমের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
অসাধারণ গুণের অধিকারী সদা হাস্যোজ্জ্বল জনপ্রিয় লোকশিল্পী কুতুব নানার জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন। সরকারি চাকরিজীবী হলেও গম্ভীরাকে তিনি নিয়ে গেছেন অনেক উচ্চতায়। তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধ আজও অনেক প্রবীণদের কাছে জাগরুক রয়েছে।
নানা কুতুবুল আলমের গম্ভীরার বড় ভক্ত ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালে নাটোর গণভবনে নানা কুতুব ও নাতি রাকিবউদ্দিন প্রথম বঙ্গবন্ধুর সামনে গঠন ও সমালোচনামূলক গম্ভীরা পরিবেশন করেন। পরিবেশিত গম্ভীরায় দুঃখ-কষ্টের কথা শুনে বঙ্গবন্ধু কেঁদেও ফেলেন। সেদিন বঙ্গবন্ধু নানা কুতুবুল আলমকে অকুণ্ঠ ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরেন। বঙ্গবন্ধু নানা কুতুবকে অত্যন্ত ¯েœহ করতেন। নানাও জাতির পিতাকে ভালোবেসে ‘বড় নানা’ বলেই সম্বোধন করতেন।
পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের জনক কুতুবুল আলম। মুক্তিযুদ্ধে তার দুই সন্তান শহীদ হন। লেখাপড়া বি.এ. পর্যন্ত করলেও পরীক্ষা দেয়া হয়নি। ১৯৫৬ সালে সচিবালয়ে ৬৫ টাকা বেতনে নি¤œমান সহকারী হিসেবে যোগ দিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৬৬ সালে কৃষি তথ্য সংস্থায় যোগ দেন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে মহকুমা পর্যায়ে ‘মাঠ সংগঠক’ পদে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বদলি হন। এরপর বিভিন্ন জেলায় বদলি হয়েছেন তিনি।
নানা কুতুবুল আলম সুফী মাস্টারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গম্ভীরা জগতে প্রবেশ করেন। এই জগতে প্রথম হাতেখড়ি ১৯৪৯ সালে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায়। প্রথম জীবনে হরিমোহন স্কুলের শিক্ষক নাইমুল হক, লুৎফল হক লুথু মিয়া ও আফসার মিয়ার রচনায় গম্ভীরা পরিবেশন করেছেন। পাশাপাশি তিনি নাটকেও অভিনয় করেছেন। তার প্রথম নাটক ছিল সাবেক সংসদ সদস্য এহসান আলী খান পরিচালিত ‘বিশ বছর আগে’। তিনি প্রায় দুশোর মতো নাটকে অভিনয় করেছেন। নিজেও পরিচালনা করেছেন গোটা ত্রিশেক নাটক। এছাড়া ঢাকার শিল্পী আনোয়ার হোসেন, হাসান ইমাম, সিরাজুল ইসলাম, গীতা দত্ত, আনোয়ারা, রানী সরকার, সুজাতাসহ আরো অনেকের সঙ্গে নাটকে অভিনয় করেছেন। দেশের বাইরে অভিনয় করেছেন শিল্পী সত্য বন্দোপাধ্যায়, তপতী ঘোষ ও রবীন মজুমদারের সঙ্গেও। দুটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন নানা কুতুব- একটি হলো ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, অন্যটি নায়ক রহমান পরিচালিত ‘দরশন’।
গম্ভীরায় সদালাপী নানা কুতুবুল আলমের নাতির ভূমিকায় ছিলেন রাকিবউদ্দিন। মূলত এই জুটিই সেই সময়ে গম্ভীরাকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে এই জুটি ভারতের দিল্লি, কলকাতা, বর্ধমান, হলদিয়া প্রভৃতি স্থানে গম্ভীরা পরিবেশন করেন। এছাড়া ১৯৭৪ সাল থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে গম্ভীরা পরিবেশিত হতে শুরু করে।
এই গুণী লোকশিল্পী প্রতিভার স্বাক্ষর হিসেবে জীবনে অনেক পুরস্কার ও সম্মান অর্জন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ১৯৮৩ সালে রাজশাহী বরেন্দ্র একাডেমি কর্তৃক গুণী শিল্পী সনদ, ১৯৮৫ সালে ঢাকাস্থ বৃহত্তর রাজশাহী জেলা সমিতি কর্তৃক গুণীজন হিসেবে প্রশংসাপত্র ও পুরস্কার, ১৯৮৬ সালে নবাবগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক গুণী ব্যক্তি হিসেবে মানপত্র ও সনদ, ১৯৮৮ সালে রাজশাহী সংগীত শিক্ষা ভবন কর্তৃক গম্ভীরা শিল্পী, গুণীজন সনদ ও পুরস্কার, ১৯৮৯ সালে নবাবগঞ্জ হরিমোহন স্কুল প্রাক্তন ছাত্র সমিতি কর্তৃক গুণীজন ও গম্ভীরা শিল্পী সনদ ও পুরস্কার, ১৯৯১ সালে ঢাকা থিয়েটার কর্তৃক ‘উৎসের সন্ধানে’র সনদ ও পুরস্কার প্রভৃতি। গম্ভীরা খ্যাত নানা কৃষিক্ষেত্রে অবদানের জন্যও ১৯৯৫ সালে ‘রাষ্ট্রপতি রৌপ্য পদক’ ও সনদ পেয়েছিলেন।