গভীর সমুদ্র থেকে সম্পদ আহরণে বহুমুখী প্রকল্প নিয়েছে সরকার

63

gourbangla logoসরকার দেশের গভীর সমুদ্র থেকে সম্পদ আহরণে ১৬শ’ কোটি টাকার বহুমুখী প্রকল্প নিয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় গভীর সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস সন্ধান ও মৎস্য আহরণের জন্য আওতায় ৯৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক মাল্টিডিসিপ্লিনারি জাহাজ কেনা হবে। তবে জাহাজটি তৈরি করতে কমপক্ষে ২ বছর সময় লাগবে। বাকি ৬৫০ কোটি টাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গবেষণা সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থা বাংলাদেশ ভূতাত্বিক জরিপ অধিদফতর (জিএসবি) ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। জাহাজটি সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানসহ অন্যান্য সম্পদ আহরণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে জরিপ ও মানচিত্রায়ণের কাজ করবে। জিএসবি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশের অগভীর ও গভীর সমুদ্রের তলদেশে অতি মূল্যবান খনিজসম্পদের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তার মধ্যে রয়েছে ইউরোনিয়াম ও থোরিয়াম। তাছাড়া অগভীর সমুদ্রে বিপুল পরিমাণ ক্লে’রও সন্ধান মিলেছে। যা সিমেন্ট তৈরির অন্যতম কাঁচামাল। তাছাড়া বঙ্গোপসাগরের ১৩টি স্থানে ভারি খনিজ বালু রয়েছে। ওই বালু ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিমানাইট, জিরকন, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইট সমৃদ্ধ। আর অগভীর সমুদ্রের তলদেশে কোবাল্ট, ভানাডিয়াম, মলিবডেনাম ও প্লাটিনামে গঠিত ম্যাঙ্গানিজ ক্রাস্ট এবং তামা, সিসা, জিংক, কিছু পরিমাণ সোনা ও রুপা দিয়ে গঠিত সালফাইডের অস্তিত্ব আছে। তাছাড়া দেশের সমুদ্রভাগে বড় ধরনের গ্যাসেরও মজুদ রয়েছে। দেশের উপকূলীয় এলাকার কিছু কিছু অংশে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামও রয়েছে। ওসব অতি মূল্যবান সম্পদ সমুদ্রের ১৪০০ থেকে ৩৭০০ মিটার গভীরে রয়েছে।
সূত্র জানায়, বিগত ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ভারত এবং তার আগে ২০১২ সালে মিয়ানমারের সাথে বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকা (টেরিটোরিয়াল সি), ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার পেয়েছে। ওই বিশাল অঞ্চলে কী পরিমাণ মৎস্য ও খনিজসম্পদ রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ১৯টি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে ব্লু ইকোনমি বা নীল সমুদ্রের অর্থনীতি হিসেবে খ্যাত ওই খনিজসম্পদ উত্তোলন করতে পারলে রাতারাতি এদেশের ভাগ্য বদলে যাবে।
সূত্র আরো জানায়, সমুদ্র সম্পদ আহরণে সরকার যে অত্যাধুনিক মাল্টিডিসিপ্লিনারি জাহাজটি কিনতে যাচ্ছে তা দিয়ে সমুদ্রের তলদেশের ১৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত স্যাম্পলিং, পানি স্যাম্পলিং, জৈবিক নমুনা, জলপথ স্যাম্পলিং, জল কলামের পর্যবেক্ষণ করা যাবে। তাছাড়া ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আঞ্চলিক সমুদ্রের হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে, এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন জরিপ কাজও পরিচালনা করতে পারবে। বঙ্গোপসাগরে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল (৬৪৮.২ কিলোমিটার) পর্যন্ত জরিপ কাজ চালানো সম্ভব হবে।
এদিকে সমুদ্রসম্পদ প্রসঙ্গে জিএসবি পরিচালক রাশেদ মোহাম্মদ আকরাম আলী জানান, সমুদ্রে সম্পদ আহরণের অত্যাধুনিক মাল্টিডিসিপ্লিনারি  জাহাজটির দৈর্ঘ্য হবে ৯০ থেকে ১০৫ মিটার আর প্রস্থ ১৬ থেকে ২০ মিটার। গভীরতা হবে ৪ দশমিক ৫ মিটার। একনাগাড়ে ৪৫ দিন সাগরে চলতে পারবে ওই জাহাজ। গতি হবে ন্যূনতম ১২ থেকে ১৪ নটিক্যাল মাইল। জাহাজে একসাথে ৬০ থেকে ৭০ জন ক্রু থাকতে পারবে। সম্পূর্ণ চিকিৎসা সুবিধাসহ জাহাজের ডেকে থাকবে একটি হেলিপ্যাডও। তাছাড়া জাহাজটিতে আনুষঙ্গিক গবেষণার উপকরণসহ সম্পূর্ণ সাইসমিক সেট, সনিক ড্রিলিং রিগ, একক ও বহু বিচ্ছুরণ ক্ষমতাসম্পন্ন ইকো সাউন্ডার, সাব বটম প্রোপাইলার, সাইড স্ক্যান সোনার থাকবে। সিটিডি প্রোপাইলার, মাল্টিসেন্সর কোর লগার, স্পিলিটার ও স্যাম্পলার, অটোমেটিক ডপলার কারেন্ট মিটার, মেরিন মেগনেটোমিটার থাকবে। তাছাড়া ডিপ ওয়াটার ক্যামেরা ও লেজার স্ক্যানার, সেডিমেন্ট কোরার, গ্রাভিটি ও সনিক ভাইব্রেটরও থাকবে ওই জাহাজে। তাতে থাকবে ওয়েট অ্যান্ড ড্রাই গবেষণাগার, নমুনা প্রসেসিং গবেষণাগার, কোর স্ক্যানিং গবেষণাগার, সাইসমিক গবেষণাগার, পলল গবেষণাগার, ডেটা প্রসেসিং গবেষণাগার, হাইড্রোকেমিস্ট্রি গবেষণাগার ও কুলিং চেম্বার।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, সাগরে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে ব্লু ইকোনমি সেল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। একটি জরিপ জাহাজ কেনার বিষয় প্রক্রিয়াধীন আছে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর (জিএসবি) দীর্ঘদিন ধওে তা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাছাড়া সন্ধান পাওয়া ইউরোনিয়াম ও থোরিয়াম বাণিজ্যিকভাবে আহরণ সম্ভব কিনা তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেজন্য একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে তারা এখন কাজ করছে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।