গবেষণা ছাড়া উৎকর্ষ সাধন সম্ভব নয় : প্রধানমন্ত্রী

5

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারো স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, গবেষণা ছাড়া আসলে উৎকর্ষ সাধন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের গবেষণা এখনো আমাদের অপ্রতুল। গবেষণা ছাড়া কখনো উৎকর্ষতা সাধন করা যায় না।’

শেখ হাসিনা বুধবার সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশবিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নবনির্মিত ‘সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল’ ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন। তিনি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিএসএমএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল ভবনে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।
প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকবৃন্দের উদ্দেশে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশবিদ্যালয়ে শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা, গবেষণা কার্যক্রমের গুণগত মানোন্নয়নের নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আপনারা এখন যেটুকু করছেন সেজন্য ধন্যবাদ জানাই, তবে গবেষণার ওপর আরো গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের গবেষণা এখনো আমাদের অপ্রতুল। তিনি বলেন, আমাদের যারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন তাদের শুধুমাত্র চিকিৎসা দিলেই চলবে না। সাথে সাথে তাদের কিন্তু গবেষণা করাও জরুরি। কাজেই এই বিষয়ে আমি আপনাদের অনুরোধ করব, যাতে আপনারা বিষয়টির প্রতি বিশেষভাবে নজর দেন।
সরকারপ্রধান এ সময় স্বাস্থ্য শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে প্রফেসর এমিরেটাস নিয়োগ দেওয়ায় বিএসএমএমইউ’র কর্মকা-ের প্রশংসা করে বলেন, ‘আপনাদের প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে বিশবিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবেন আপনাদের কাছে সেই আহ্বানই জানাই।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব সাইফুল হাসান বাদল এবং বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত লি জেং কিউন। বিএসএমএমইইউ’র ভিসি অধ্যাপক ডা শরফুদ্দিন আহমেদ স্বাগত বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল এবং বিএসএমএমইউ’র সার্বিক কর্মকা- বিষয়ে পৃথক দুটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
প্রায় ৪ একর জমির ওপর মোট ১ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল ১ হাজার কোটি কোটি টাকা প্রদান করেছে। সরকার বরাদ্দ করেছে ৩৩০ কোটি টাকা এবং বিএসএমএমইউ ১৭০ কোটি টাকা দিয়েছে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং আধুনিক অপারেশন থিয়েটারসহ, হাসপাতালটি যে কোনো সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসক দ্বারা রেফার করা সমস্ত গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করবে। প্রায় ৫ থেকে ৮ হাজার রোগী হাসপাতালের আউটডোর পরিষেবা পাবেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাসপাতালে ৭৫০ শয্যা থাকবে। এছাড়াও ১৪টি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার, একটি ১০০ শয্যার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, একটি ১০০ শয্যার জরুরি ইউনিট, ছয়টি ভিভিআইপি এবং ২২টি ভিআইপি কেবিন এবং ২৫টি ডিলাক্স কেবিন থাকবে। বিশেষায়িত পরিষেবাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন, জিন থেরাপি এবং রোবোটিক সার্জারি।
১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবর তৎকালীন পিজি হাসপাতালের রক্ত সংরক্ষণাগার এবং নতুন মহিলা ওয়ার্ডের উদ্বোধনকালে জাতির পিতার বক্তব্যের একটি অংশের উদ্ধৃতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী ধর্ম-বর্ণ ও দলমত নির্বিশেষে সকল রোগীর প্রতি সমান দরদে চিকিৎসায় এগিয়ে আসার জন্য চিকিৎসক সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।
জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘আপনারা ডাক্তার আপনাদের মন হতে হবে অনেক উদার, আপনাদের মন হতে হবে সেবার। আপনাদের কাছে কোনো বড় ছোট থাকবে না, আপনাদের কাছে থাকবে রোগ, কারো রোগ বেশি কারো কম। তাহলেই সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে। আপনারা মানুষের সহযোগিতা পাবেন।’
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ডাক্তারদের শহরকেন্দ্রিক না থেকে উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে স্বাস্থ্য সেবাকে তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ারও আহ্বান জানান। পাশাপাশি অনলাইনে চিকিৎসা সেবাও জোরদার করার পরামর্শ দেন। তিনি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, সেবার মান যাতে বাড়ে সে জন্যও ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারপ্রধান বলেন, মাঠপর্যায়ে এখনো চিকিৎসক-নার্সের অভাব দেখা যায়। অনেকেই মাঠপর্যায়ে যেতে চান না। সবাইকে রাজধানীতেই থাকবে হবে এমন নয়। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি চিকিৎসকদের দেখার অনুরোধ করছি। যেন উপজেলা পর্যন্ত মানুষ চিকিৎসা সেবা পায়।
চিকিৎসকদের উদ্দেশ করে শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের সেবা করুন, মানুষের পাশে দাঁড়ান। কারণ, আমার তো মনে হয় ওষুধের থেকেও একজন ডাক্তারের মুখের কথায় আশ্বস্ত হলে তার অর্ধেক রোগ ভালো হয়ে যায়। কাজেই এই আশ্বস্ত যেন রোগীরা পায় সেই ব্যাপারে প্রতিটা ডাক্তারকে আন্তরিকতার সাথে দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে খুব অল্প খরচে চিকিৎসা নিতে আসেন। তারা যেন উন্নত চিকিৎসা পায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে সরকারের নেয়া উদ্যোগের সুফল পাচ্ছে দেশের মানুষ। বেসরকারি খাতে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বেসরকারি খাতেও স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠিত অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের বাংলাদেশে আসার সুযোগ করে দিতে হবে বলে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, এ বিষয়ে আমাদের ডাক্তারদের উদার হতে হবে। দরজা বন্ধ করে রাখলে আলো-বাতাস বাসায় ঢোকে না। এ বিষয়ে বিশেষভাবে ভাববেন। শেখ হাসিনা বলেন, দেশে অনেক প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক রয়েছেন। তাদেরও সামনে আসার সুযোগ করে দেওয়া উচিৎ। তারা যেন তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন। তাদের সঙ্গে কাজ করলে অভিজ্ঞতা বাড়ার সুযোগ হবে। এ বিষয়ে আরো বেশি উদার হতে হবে।
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল দেশের চিকিৎসাসেবায় নবদিগন্ত উন্মোচিত করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এ হাসপাতাল চালু হলে বাংলাদেশের বার্ষিক আনুমানিক ৩৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশে অনেক বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে প্রথম মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথাও অনুষ্ঠানে স্মরণ করে এবং প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে একটি করে মেডিকেল বিশবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতেও তার সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণের উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকারপ্রধান চলমান বিশ্বমন্দার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সকলকে সাশ্রয়ী হবার এবং উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আমাদেরও নিজেদের উৎপাদন বাড়াতে হবে। করোনা মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সামনে আরো কঠিন সময় আসবে। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের দেশে দেশে দুর্ভিক্ষ আসার কথাও এ সময় সকলকে স্মরণ করিয়ে দেন।