ক্রিকেট-স্বপ্নের চারণভূমি রাজশাহীতে

94

“অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ট্রায়াল চলছিল। হৃদয় রান আউট হলো অল্প রানে। টিকল না দলে। আমি পরে বিসিবির জুনিয়র নির্বাচকদের বললাম ছেলেটাকে ভালো করে দেখতে। তারা দেখলেন। এবার হৃদয় টিকে গেল। এখন সে অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলের অন্যতম ব্যাটিং ভরসা”-গর্ব নিয়ে বলছিলেন খালেদ মাহমুদ। বাংলাদেশের ক্রিকেটে মাহমুদের পরিচয় অনেক। তবে এখানে বলছিলেন বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমির প্রধান কোচ হিসেবে।
অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ঢোকার আগে গত প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে ঝড় তুলেছেন তৌহিদ হৃদয়। শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে করেছেন ৬৮৮ রান। এখন দেশের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষায়। তার ক্রিকেট শিক্ষা, ক্রিকেটার হিসেবে বেড়ে ওঠা এই বাংলা ট্র্যাক একাডেমিতেই।
শুধু হৃদয় নন, প্রথম বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রিমিয়ার লিগে ওঠা শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের প্রায় সব ক্রিকেটারই বাংলা ট্র্যাক একাডেমির। দ্বিতীয় বিভাগে চ্যাম্পিয়ন এক্সিওম ক্রিকেটার্সের সব ক্রিকেটারও বাংলা ট্র্যাক একাডেমিরই। এই একাডেমির ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া দল মোহাম্মদপুর ক্রিকেটার্স তৃতীয় বিভাগে হয়েছে রানার্সআপ।
বাংলা ট্র্যাক একাডেমিতে নিজেকে শাণিত করেই আজ বাংলাদেশ টেস্ট দলের স্পিন ভরসা হয়ে উঠেছেন তাইজুল ইসলাম। বয়স ভিত্তিক ক্রিকেটে আলো ছড়ানোর পর ঘরোয়া ক্রিকেটেও পারফর্ম করছেন এই একাডেমির মাইশুকুর রহমান, নাঈম ইসলাম জুনিয়র, নিহাদ-উজ-জামানরা। ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলছেন আরও অনেকে। একই স্বপ্ন নিয়ে তৈরি হচ্ছেন আরও শতশত কিশোর-যুবা।
ক্রিকেটের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, অনেক ঘাম-শ্রম, স্বদিচ্ছা আর আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেছে রাজশাহীর এই ক্রিকেট একাডেমি।
পথচলার শুরু
বাংলা ট্র্যাক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিনুল হকের ভাবনা ও চাওয়ায় জন্ম এই একাডেমির। ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তার ইচ্ছে ছিল ক্রিকেটে অবদান রাখার। সেটি হতে পারত নানাভাবেই। তবে তিনি চেয়েছিলেন ক্রিকেটের সত্যিকারের উপকারে লাগে, এমন কিছু করতে। ক্রিকেটের পাঠশালার চেয়ে আদর্শ কিছু আর কী হতে পারে!
রাজশাহী শহরের উপকণ্ঠ কাটাখালিতে ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু হলো বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমির। ক্রিকেট দুনিয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জে জয়ী হওয়ার প্রাথমিক পাঠ দেওয়ার কাজটি বছরে পর বছর ধরে নিভৃতে করে চলেছে এই একাডেমি। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে একাডেমির ছাত্র সংখ্যা, বেড়েছে সুযোগ-সুবিধার পরিধি। সঙ্গে স্বপ্নের পরিধিও!

অবকাঠামো
প্রায় ১১ একর জায়গা জুড়ে গড়া হয়েছে একাডেমি। বড় একটি মূল মাঠের সঙ্গে অনুশীলন মাঠ আরও দুটি। অনুশীলন নেট ৯টি। আছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ একটি ইনডোর। মৌলিক কিছু সুযোগ-সুবিধা নিয়ে একটি জিমনেশিয়াম। বোলিং মেশিন আছে দুটি, আছে স্পিড গান, ভিডিও বিশ্লেষণ ব্যবস্থা।
একাডেমি কমপ্লেক্সে আছে পুকুর, মসজিদ, ডাইনিং, মিটিং রুম, ফিজিও রুম। দূর-দূরান্তের ক্রিকেট শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা। আপাতত সেখানে থাকতে পারে ৬০ জন, যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা আছে সুইমিংপুল তৈরিসহ সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানোর।
কোচিং
একাডেমির শুরুর দিকে প্রধান কোচ ছিলেন খালেদ মাহমুদ। পরে দায়িত্বে ছিলেন সরওয়ার ইমরান। গত কয়েক বছর ধরে আবার ফিরেছেন মাহমুদ। শুধু সাবেক জাতীয় অধিনায়ক বা বর্তমানে বিসিবি পরিচালকই নন, মাহমুদ একজন লেভেল-৩ সম্পন্ন করা কোচও।
সপ্তাহে তিনদিন ঢাকা থেকে রাজশাহী গিয়ে কোচিং করান মাহমুদ। দেশে থাকলে তার এই রুটিনের ব্যতিক্রম হয় সামান্যই।
প্রধান সহকারী কোচ সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার আমিনুল ইসলাম ভোলা। সহকারী কোচ হিসেবে সঙ্গে আছেন সাবেক ক্রিকেটার আনিসুর রহমান সঞ্চয়, গোলাম রব্বানী হিমেলসহ মোট সাতজন। সহকারী কোচদের নূন্যতম যোগ্যতা লেভেল-২ কোচিং কোর্স। এ ছাড়া ফিজিও হিসেবে আছেন বিসিবির ফিজিও হিসেবে কাজ করা আমানত উল্লাহ মুন।
এগিয়ে চলা
কালো ট্রাউজার, নীল জার্সি। বাইরে থেকে চোখ রাখলেই দেখা যাবে, একই পোশাকে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শত শত ছেলে। এক পাশে নেট অনুশীলন তো আরেক পাশে নক করা। কোথাও ফিল্ডিং অনুশীলন, কোথাও বা চলছে মৌলিক প্রশিক্ষণ। কেউ কেউ আবার ব্যস্ত গা গরমে, কেউ বা ইনডোরে। প্রতিদিনই চলে এই বিশাল ক্রিকেটযজ্ঞ।
এই মুহূর্তে প্রায় সাড়ে ছয়শ ছাত্র ক্রিকেটের তালিম নিচ্ছেন এই একাডেমিতে। মূলত তিনটি বয়সভিত্তিক গ্রুপে ভাগ করে চলে অনুশীলন-অনূর্ধ্ব ১৪, অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৯। তবে প্রধান কোচ খালেদ মাহমুদ জানালেন, সামর্থ্যরে ভিত্তিতে ভাগ করেও দেওয়া হয় প্রশিক্ষণ। মোটামুটি পোক্ত হয়ে ওঠাদের জন্য একরকম প্রশিক্ষণ, মাঝারিদের আবার একটু আলাদা, নতুন শুরু করাদের অন্যরকম।
একাডেমিতে যোগ দিতে পারেন যে কেউ। তবে পাকাপাকি ভাবে টিকতে হলে উতরাতে হবে পরীক্ষায়। পরীক্ষাটি ক্রিকেটীয়। নতুন কেউ এলে তাকে কয়েকদিন ভালো করে পরখ করেন একাডেমির কোচরা। তার মাঝে যদি সামান্যতম সম্ভাবনার রসদও থাকে, তাহলে রেখে দেওয়া হয়।
শুধু রাজশাহী বা উত্তরাঞ্চলের নয়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছেলেরা আসে এখানে। একাডেমিতে অথবা কাছেই থাকে মেস করে। ক্রিকেটের পাশাপাশি পড়াশোনাও চলে কাছের কোনো স্কুল-কলেজে।
একাডেমির নির্ধারিত মাসিক ফি ১ হাজার টাকা। তবে সেটা পাওয়া যায় কম জনের কাছ থেকেই। সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ দেয় ৫০০, কেউ ৩০০। এইটুকও দেওয়ার সামর্থ্য নেই যাদের, তাদের জন্য পুরো ফ্রি। থাকা-খাওয়া ফ্রি অনেকেরই। এই একাডেমির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব এটিই। প্রতিভা থাকলে এখানে পথের দেখা মিলবেই। দারিদ্র বা অন্য কোনো পারিপার্শ্বিকতা হয়ে দাঁড়ায় না বাধার দেয়াল। বাংলা ট্র্যাক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক ইকরামুল হক জানালেন, তাদের চাওয়া, একটি প্রতিভাও যেন ঝরে না পড়ে।
“বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমি গড়া হয়েছে স্বপ্নাতুর ক্রিকেটারদের পরিচর্যায় সম্ভব সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা দেওয়ার জন্য। দেশে অসংখ্য ক্রিকেট প্রতিভা আছে, যারা ¯্রফে উপযুক্ত পরিচর্যার অভাবে ও সঠিক সময়ে খুঁজে বের করা যায় না বলে ঝরে পড়ে এবং ক্রিকেটের মূল ¯্রােতে আসতে পারে না। আমরা চাই, সংখ্যাটি কমে আসুক।”

বাধা নয় দারিদ্র্য
নাঈম ইসলাম জুনিয়রের উঠে আসার গল্প শোনাচ্ছিলেন একাডেমির ম্যানেজার শামীম হোসেন, “নাঈম তখন অনেক ছোটো। অর্থের অভাবে একাডেমিতে আসা বন্ধ করেছিলো। আসা-যাওয়ার টাকাও ছিল না। আমরা একাডেমি থেকে তারা যাতায়াত ভাতার ব্যবস্থা করি। সেই নাঈম এখন ভালো খেলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, একাডেমির ছেলেদের সাহায্য করে।”
একই গল্প তৌহিদ হৃদয়ের। আসা-যাওয়ার খরচ পোষাতে না পারায় বন্ধ করেছিলেন ক্রিকেট খেলা। একাডেমির লোকজন গিয়ে বাড়ি থেকে আবার নিয়ে এসেছেন, আসা-যাওয়ার খরচ জুগিয়েছে একাডেমি।
তাইজুল, নিহাদদের গল্পটাও প্রায় একই রকম। কম-বেশি এরকম গল্প আছে আরও শতশত ক্রিকেটারের। বিনামূল্যে ক্রিকেট প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একাডেমি শুধু তাদের আসা-যাওয়ার খরচই দেয় না, সাধ্যমত খাওয়ার খরচও দেয় অনেককে। ক্রিকেট এগিয়ে চলার পথে দারিদ্রতাকে বাধা হতে দেয় না এই একাডেমি।
অভিভাবকদের অনেকেও এখন বুঝতে পারেন, ক্রিকেট শুধু শখের খেলা নয়, হতে পারে ভবিষ্যতের পাথেয়। দারুণ একটি পেশা। বাড়ছে সচেতনতা। সেটির ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে একাডেমিতেও। উঠতি প্রতিভাবান ব্যাটসম্যানদের একজন, আশরাফুল শোনালেন তার জীবনের গল্প।
“আমার বাবা কৃষক। অনেক সমস্যা আছে বাড়িতে। তবে আব্বা সবসময় উৎসাহ দেন। আমাকে বলেন, কোনো কাজ করার দরকার নেই, শুধু মন দিয়ে খেলতে হবে। টিভিতে খেলা দেখলে বলেন সেভাবে খেলতে, বড় হয়ে যেন ওই বড় বড় ক্রিকেটারদের মত হই।”
শুধু এটিই নয়, আরও বড় বড় সামাজিক সমস্যা মোকাবেলায় ক্রিকেটকেই হাতিয়ার করেছে এই একাডেমি। মাদক ও জঙ্গীবাদে জড়ানো এই অঞ্চলের অনেক পুরোনো সমস্যা। কিন্তু যে বয়স এসবে জড়ানোর সময়, শতশত ছেলে এখন বুঁদ হচ্ছে ক্রিকেটে। একাডেমির কাছেই কাটাখালি বাজারে বেশ কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ক্রিকেটের কারণে অনেক ভালো হয়েছে এলাকার পরিবেশ।
বাংলা ট্র্যাক কমিউনিকেশন্সের চেয়ারম্যান নাজিম আসাদুল হক বললেন, শুধু ভালো ক্রিকেটার নন, ছেলেদের গড়ে তুলতে চান তারা ভালো মানুষ হিসেবে।
“আমরা ছেলেদের এমন একটি প্ল্যাটফর্ম দিতে চাই, যেখানে শুধু স্পোর্টসম্যানশিপ বা ক্রিকেট স্কিলের শিক্ষা দেওয়া হবে না, নেতৃত্বগুণাবলী সম্পন্ন ও শৃঙ্খলাবদ্ধ মানুষ হিসেব্ েগড়ে তোলা হবে। এই বয়সের অনেকে যেমন সমাজবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ে, আমরা চাই ওরা যেন ক্রিকেটে মগ্ন হয়ে ওসব থেকে দূরে থাকে।”

ভবিষ্যৎ ভাবনা
আয় যতটুকু আছে, তার চেয়ে একাডেমির ব্যয় অনেক বেশি। একাডেমির পথচলা মসৃণ করতে চাই একটি ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়েছে। সেখান থেকেই পরিচালনা করা হয় ব্যয়ভার। আর্থিক সঙ্কটে তাই একাডেমির থমকে চলার শঙ্কা নেই বললেই চলে।
তার পরও বাংলা ট্র্যাক লিমিটেডের চেয়ারম্যানের চাওয়া, একাডেমি যেন পরিচালনার ব্যয় বহন করতে পারে নিজস্ব আয়েই। ক্রিকেটারদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে খোঁজা হচ্ছে অবকাঠামোগতভাবে আয় বাড়ানোর পথ। সেটি সম্ভব হলে ফাউন্ডেশনের অর্থ থেকে আরও বাড়ানো হবে একাডেমির সুযোগ-সুবিধা।
পরিকল্পনা তাদের অনেক। বাস্তবায়নের স্বদিচ্ছারও অভাব নেই। খালেদ মাহমুদের লক্ষ্য তাই বিশাল, “আমরা যদি সব পরিকল্পনা মতো এগোতে পারি, একদিন তাহলে নিশ্চিত করেই ছাড়িয়ে যেতে পারব বিকেএসপিকে।”