কৃষিবান্ধব বিপ্লবের সূচনা

113

gourbangla logoদেশের একমাত্র বৃহত্তম হর্টিকালচার সেন্টার। সরকারী এই কৃষি খামারের অবস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার কল্যাণপুরে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের খাদ্যশস্য উইং এই বিশাল কৃষি খামারের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ১৯৫৬ সালে তদানিন্তন সরকারের কৃষি বিভাগ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৬৮ সালে বিএডিসির নিয়ন্ত্রণ ভার নিয়ে মাত্র ৬ বছরের মাথায় ১৯৭৩ সালে উদ্যান উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যান বেস রূপে রূপান্তরিত হয়। সেটাও টিকে মাত্র ৯ বছরের কাছাকাছি। ১৯৮২ সালে চলে যায় সম্পূর্ণভাবে খাদ্যশস্য উইংয়ের আওতাধিন হর্টিকালচার সেন্টারের কাছে। যার মাধ্যমেই পরিপƒর্ণতা পেয়ে এখন মহিরূপে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালীন এটি ৭২.৭২ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠা হলেও পরবর্তীতে আংশিক চলে যায় লাক্ষা রূপ ও বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার, বিনার কাছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান হর্টিকালচার চত্বরের বাইরে যে কোন স্থানে ভূমি দখলের মাধ্যমে করতে পারত কিন্তু কিছু আমলার একগুয়েমির কারণে তা সম্ভব হয়নি। এই নিয়ে স্থানীয়ভাবে বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি বাধা দিয়েও পেরে উঠেনি। অবশ্য সেন্টারের মূল বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোন বিভাজন বা ক্ষতি হয়নি। এক কথায় বিশাল এই হর্টিকালচার সেন্টারটি শহরের এখন অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হওয়াসহ পিকনিক স্পটে পরিণত হওয়ার কারণে সব মৌসুমেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নানান ধরনের যানবাহন হাঁকিয়ে নানান পেশার মানুষ ছুটে আসেন এখানে। বিশাল আম বাগানের ছায়ার নিচে অবস্থান করে সমগ্র চত্বর ঘুরে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আবার ফেরার নিয়ত করে ফিরে যান। এই সেন্টারের নার্সারি এলাকা ১৪.০০ একর, স্থায়ী বাগান ১৮.০০ একর, সবজি উৎপাদন এলাকা ১২ একর জুড়ে। পুকুর রয়েছে দুটি। তার মধ্যে একটি ছোট অপরটি অবস্থান প্রায় দুই একরের কাছাকাছি। অফিস, ডর্মেটরি, বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট ১৮.০০ একরের উপর। এ ছাড়াও নিচু জলাভূমির মতো জঙ্গলে ভরা জমির পরিমাণ ৮.৭২ একর ছাড়িয়ে যাবে।এখানে ফলের চারা/কলম উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়, সবজি ও মসলার চারা উৎপাদন ও বিতরণের ব্যবস্থা রয়েছে। একই জিনিসের বীজও উৎপাদন হয়ে থাকে এই ফার্মে। শোভা বর্ধণকারী ফুল গাছের ও মৌসুমী ফুলের চারা/কলম উৎপাদন ও বিতরণেও সুনাম কুড়িয়েছে। ফল ও অন্যান্য মাতৃ গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করা হয় নিপুণভাবে। ফল, ফুল, সবজি ও মসলার নতুন জাতের জার্ম, প্লাজম সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও উৎপাদন করা হয়। উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় শ্যামল গ্রামের কৃষক কৃষাণীসহ অন্য কৃষকদের বিভিন্ন ফল সবজি ও মসলা চাষের উপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন গ্রামে মৌসুমী ফল, সবজি ও মসলার প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করাসহ বেসরকারী নার্সারি মালিকদের নানান ধরনের পরামর্শ দেয়া হয়। এমনকি ফল বাগান স্থাপনেও নিবিড়ভাবে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে থাকে এই সেন্টার। এছাড়াও আইপিএম টিওটি পরিচালনা করে থাকে নিয়মিত। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে প্রত্যক্ষ শিক্ষা নিতে এই হর্টিকালচার সেন্টারে ছুটে আসেন। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরিরত কৃষি বিজ্ঞানীরা হর্টিকালচার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে বিভিন্ন মৌসুমে ব্যাচ ধরে এখানে এসে ভিড় করেন। দু’জন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, চার অফিসার ও প্রায় ৩৫ লেবার সার্বক্ষণিক নানান ধরনের দেখভাল করে থাকে ফার্মের। তবে এখানে শতাধিক লেবার ও দুই ডজনের অধিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কৃষিবিদ ও হর্টিকালচারিস্ট থাকলে এর উন্নয়নে আরও গতি আসতে পারত বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই সেন্টারের বর্তমানে আমের জাত রয়েছে ৪৪টির অধিক। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১২টি বিদেশী জাত। বিশেষ করে গোলাপখাস, ডারভাঙ্গা, ধনুয়া, কালুয়া, রতা, আলমশাহী, মল্লিকা, আমনদোসেরী, সমরবেহেস্তচৌষা, আনোয়ার আতাউল, ভাদুরা, ত্রিফলা, অমৃতভোগ, লতারোম্বাই শাহপছন্দ, নারকেলপাকি, কালাপাহাড়, আলফানসো, সফেদাসহ একাধিক জাত সমৃদ্ধ করেছে সেন্টারের আম ফসলের। এ ছাড়াও লিচুর দুটি জাতের ৯০টি গাছ, ফুলের চারটি জাতের দুই শতাধিক গাছ, নারিকেলের ৩টি জাতের আড়াইশত গাছ, সুপারি ও সফেদার ৩৪০টি গাছ ছাড়াও রয়েছে আমলকী, জলপাই, বেল, জাবাটিকা (বিদেশী), গোলাপজাম, করমচা, আমড়া, আঙ্গুর, কমলা, তিন ধরনের লেবু, তাল, খেজুর, আতা, জাম, তেতুল, সিলিঙ্গি, আপেল, নাশপাতি, ডুমুর, কদবেল, শরীফা, চালতা, ডালিমের অসংখ্য জাত ও আর গাছে ভর্তি সেন্টার। নেই কোন জাতের গাছ? এছাড়াও মসলা জাতের মধ্যে তেজপাতা, দারুচিনি, গোলমরিচ, মিক্সট মসলা বাদেও শানতৈল, কাঠবাদাম, কদম, মহুয়া মিলিয়ে নানান জাত আর পাতে ভর্তি ফার্মের আনাচ কানাচ। কোনটা নেই বলা যাবে না। এসবের পাশাপাশি শোভা বর্ধণকারী ফুলের গাছের কথা বলা চলে। প্রায় ২৮ জাত রয়েছে এর মধ্যে অরোকেরিয়া, পয়েন্সিটিয়া, রঙ্গন (বড়), রঙ্গন (ছোট), চায়না ছোট ও মাঝারি, বাগান বিলাম, যুজা, ড্রেসিনা, মাধবীলতা, হানিসিকলাস, লতাঝাউ, চায়নিজ ঝাউ, মুসান্ডা-সাদা, গোলাপি, লাল, শিউলি, কাঞ্চন, রিবনবুস, বেলী, টগর, মালফুজিয়া, টুডে-টু-মরো, এ্যালামুন্ডা, গোল্ডেন সাওয়ার, ইন্ডিয়ান টগর, কোটমল্লিকা, কামিনী, লেনটিনা, বোটল ব্লাস, আইলোডী, চেরি: সাদা, লাল, ক্ষিরণী উল্লেখযোগ্য। এর বাইরেও রয়েছে অনেক জানা অজানা নাম। যেমন বধূবরণ গেট গাছ। ফার্মে রয়েছে নানান ধরনের বনজ গাছ ও তার চারা। নিম, সেগুন, মেহগনি, বাবলাসহ প্রায় ১৭টি জাত উল্লেখ করার মতো। আবার ফিরে আসি আমের জাতে। ফার্মে প্রতিবছর নতুন নতুন জাত সংযোগন হচ্ছে। সেই ১৯৯৬ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত প্রায় ৪১টি নতুন জাত এসে ঠাঁই করেছে এই ফার্মে। এর মধ্যে মায়ানমার বৈশাখী, চম্পা, রাংগোয়াই, লেদেমনি, গৌড়মতিসহ ২১টি জাত নিয়ে কাজ করছে হর্টিকালচারের কর্মকর্তারা। ২১টি স্থানীয় উন্নত জাতও রয়েছে। এই হর্টিকালচার সেন্টারে একটি আধুনিক ল্যাব ও পর্যাপ্ত পরিমাণ গবেষক থাকলে অনেকটাই জাত উন্নয়নে প্রভূত কাজ হতো। অধিকাংশ নতুন জাত ভারত থেকে আসলেও পিছিয়ে নেই মিয়ানমারসহ একাধিক দেশ। স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে আমের নতুন জাত। এই পর্যন্ত এই কেন্দ্রে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহীত জাতের সংখ্যা ২৫ ছাড়িয়ে গেছে। অন্যান্য ফলের জাত সংগ্রহের দিকেও নজর রয়েছে এই ফার্মের উপ-পরিচালক ড সাইফুর রহমানের। প্রায় ৪০টি বিভিন্ন জাতের ফলের চারা সংগ্রহ করেছেন তিনি। এসব জাতের মধ্যে ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দেনেশিয়াসহ দেশের বিভিন্নস্থান থেকে সংগৃহীত এসব ফলের জাতের সংখ্যা প্রায় ৫০টি। তার মধ্যে ১৯৯৮ পর্যন্ত ছিল ২৩টি। পরবর্তীতে তাইওয়ান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা অন্যতম। শুধু শ্রীলঙ্কা থেকে আনা হয়েছে ৮টি জাত। এর মধ্যে কফি কোকো, এনোডা, এডোকেডো, রামবুটান, এনথেরিয়াম, জানিলা ও গোলমরিচ। অন্যান্য দেশ থেকে আনা হয়েছে মালটা, প্যামন ফল, কর্পূর, এলাচি লেবু, হাইব্রিড কলা, করমচা, পামওয়েল, চেরি, নাসপাতি ম্যাংগোস্ট্রিন ও সাম্প্রতিক কালের ড্রাগন গাছ সন্নিবেশিত হয়েছে কল্যাণপুর হর্টিকালচারে। এ ছাড়াও নতুন জাতের ওল ও আখ চাষ করা হচ্ছে। ছোট ছোট গাছে থোকা থোকা বিদেশী আমড়া ঝুলছে। সাধারণত ফল গাছের চারা লাগিয়ে ফল পেতে ৮/১০ বছর সময় লাগে। এই জট থেকে বেরিয়ে আসার গবেষণায় সফল হয়েছে এই সেন্টারের কৃষি বিজ্ঞানীরা। পূর্বে যেখানে চারা লাগিয়ে ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হতো, আবার কোন কোন ফলের ক্ষেত্রে সাধারণ পদ্ধতিতে কলম করা যায় না। যেমন কাঠাল, জাম, বেল, তেতুঁল, আমলকী, কদবেল, জাবাটিকা ইত্যাদি। কিন্তু ক্লেফট গ্রাফটিং পদ্ধতিতে কলম তৈরি করে ১-৩ বছরের মধ্যে ফল উৎপাদন করা সম্ভব। এতে আবার মাতৃগাছের গুণাগুণ সম্পূর্ণ বজায় থাকে। এ উদ্দেশ্যেকে সামনে রেখে হর্টিকালচার সেন্টারে ব্যাপক হারে সাফল্যজনকভাবে নিম্নক্ত গাছে ক্লেফট গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আম, জাম, কামরাঙ্গা, পেয়ারা, আমলকী, বেল, তেতুঁল, লেবু (হাইব্রিড), কাঁঠাল, জলপাই, ডুমর (পাকিস্তানী) কদবেল, জাবাটিকা, ঢেওয়া, বাতাবী লেবু, ডালিক ও শতাধিক জাতের ফুলে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে যে সাফল্যও বিপ্লব এসেছে তা অবর্ণনীয় ও প্রচ-ভাবে লাভজনক। এবার ফলের চারা, সবজি বীজ, সবজির চারা তৈরি করে বিক্রির একটি খন্ডিত চিত্র তুলে ধরব। ফলের চারা ও কলম উৎপাদন ও বিতরণে ১৯৯৪-৯৫ সালে উৎপাদন ২ লাখ ৫২ হাজার ৮০৮, ৯৫-৯৬ সালে ২ লাখ ৫৪ হাজার, ৯৬-৯৭ হতে ২ লাখ ১৯ হাজার, ৯৭-৯৮ সালে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৮শ’ ৯৮-৯৯ ও ২০০০ সালে তা বেড়ে ৫ লাখ ১ হাজার ৪৪-৪ লাখ, ৮৯ হাজার। এর মধ্যে বিতরণ ৭০ শতাংশ। পাশাপাশি সবজি বীজ উৎপাদন কেজিতে ১৯৯৪-৯৫ সালে ৬০০ কেজি পরের বছর ১৬০০ কেজি, ৯৬-৯৭ ও ৯৮ সালে প্রায় দুই হাজার কেজি এবং ৯৯-২০০০ এ ১৪০০.১৪০০ কেজি। যার পুরোটা স্থানীয়সহ পুরো দেশে বিতরণ করা হয়েছিল। সবজি চারার ক্ষেত্রেও এই পাঁচ বছরে অর্থাৎ ১৯৯৪ থেকে ২০০০ পর্যন্ত প্রায় ১৮ লাখ চারা উৎপাদন ও সমানসংখ্যক বিতরণ হয়েছিল। যার কারণে পাঁচ বছর মিলিয়ে এই হর্টিকালচার সেন্টার চারা কলম উৎপাদন ও অন্যান্য খরচ বাবদ ৪০ লাখ টাকা খরচ হলেও আয় হয়েছিল প্রায় ৬০ লাখের কাছাকাছি। কর্মচারীদের বেতন ভাতা খরচা আলাদা। এই পাঁচ বছরে হর্টিকালচার সেন্টার সেবামূলক কাজও করেছে। ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষাণীদের বসতবাড়িতে বা আঙ্গিনায় সবজি ও ফলজ আবাদে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। এছাড়াও এ্যাসপারাগাছের বীজ ও চারা, পিয়াজের কন্দ ও বীজ, ওলবীজ, বারমাসি সজিনা কাটিং ও আইপিএস প্রশিক্ষণ দিয়েছে প্রান্তিক চাষীদের। এছাড়াও অসামান্য অবদান রেখেছে কৃষকদের মাঝে গিয়ে লাউয়ের উপর তরমুজের। শশার পেগ গ্রাফটিং, জংলী বেগুনে উন্নত বেগুনের গ্রাফটিং। প্রায় ১০টি বিষয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দিয়েছে প্রান্তিক কৃষকদের। এই বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সময় আর্থিক অনুদানের অবয়বে দিনভার পরিশ্রম দিয়েছে ফার্মের সব শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এবার খন্ডিত চিত্রের অপর অংশ তুলে ধরব বিগত তিন বছরের। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে উদ্যান ফসল, আলু, সবজি, মসলা, ফল ও ফুলের বাম্পার উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। যার কারণে এই সময়ে এই হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে ৫ লাখ ২৮ হাজার ২৯৫টি ফলের, ৩৫ হাজার ৩৫০টি ফুলের চারা/কলম, ২৯ হাজার মসলা চারা/কলম, ২ লাখ ৬৯ হাজার ২৫০ সবজি চারা এবং ৯ হাজার ৬০টি শোভা বর্ধণকারী চারা কলম উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে এই সেন্টার। পাশাপাশি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য প্রধান অর্জন সমূহের মধ্যে রয়েছে ফলের চারা/কলম উৎপাদন হয়েছে ২০ লাখ ৮০ হাজারটি, মসলার চারা/কলম উৎপাদন ১১ হাজারটি, সবজির চারা উৎপাদন ১ লাখ ৫ হাজারটি ঔষধী চারা/কলম উৎপাদন ২ হাজার ছয় শতটি, শোভাবর্ধণকালী উদ্ভিদের চারা কলম উৎপাদন ৩ হাজার ২শতটি, ফুলের চারা/কলম/কাটিং ২৫ হাজার ৭শতটি, বিশেষ কর্মসূচীর চারা উৎপাদন ২২ হাজারটি। এর বাইরেও চলমান অর্থবছরে চারা উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ছিল ৩ লাখ ৯৫ হাজার। ছয় মাস এখনও বাকি। বর্তমান সময়ে উৎপাদিত চারা কলমের সংখ্যা ১,০৫,০০০টি, বছরব্যাপী উৎপাদনের পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প ও বাণিজ্যিক মিশ্র ফল বাগান যা প্রদর্শনী হিসেবে দেখানো হয়েছে। তা হচ্ছে ৩২টি ফল বাগান, বাণিজ্যক ৯টি, গোম গার্ডেন ৪০টি, ড্রাগন ৮টি ও নারকেল ১৫০টি। উপর্জনের পরিমাণও হয়েছে নজরকারা। এসব নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনাও নিয়ে রেখেছে হর্টিকালচার সেন্টার চাঁপাইনবাবগঞ্জ। চাষী পর্যায়ে উন্নত ও গুণগত মানসম্পন্ন উদ্যান ফসলের চারা/কলম, বীজ উৎপাদন ও বিতরণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও সার ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার উপযোগী কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি, বছরব্যাপী ফল প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, রফতানির লক্ষ্যে মানসম্পন্ন ফসল উৎপাদন ও বাজার উন্নয়নে ই-কৃষি প্রবর্তন এবং কৃষিতে খামার যান্ত্রিকীকরণে সার্বিক উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন, জোনভিত্তিক উদ্যান ফসলের উৎপাদন ও তা প্রক্রিয়াকরণে পর্যাপ্ত শিল্প স্থাপন, সর্বস্তরের পুষ্টি শিক্ষার প্রসার, উপযুক্ত অবকাঠামোগত বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, কৃষিতে নারীর অধিকতর সম্পৃক্তায়নে দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ।এসব বাস্তবায়নে বিশাল অর্থের প্রয়োজন হবে। তবে সরকার প্রস্তাব সমূহ বিবেচনা এনে আলাদা প্রজেক্ট বা জনবল বৃদ্ধিসহ হর্টিকালচার সেন্টারকে সহযোগিতা দিলে শুধু এই অঞ্চলে নয় দেশে কৃষি বিপ্লবের সমূহ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে। একই সঙ্গে বাড়বে কর্মসংস্থান। যার যোগান কৃষি উৎপাদন থেকেই পূরণ হবে। হর্টিকালচার সেন্টার চাঁপাইনবাবগঞ্জ পূর্বের চারা ও বীজ উৎপাদনের কৌশলগত কিছু পরিবর্তন আনলেও তারা পূর্বের অবস্থানের মতোই আর্থিকভাবে সরকারকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। বলা চলে এটি এখন বড় ধরনের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। যার কারণে সার্বক্ষণিক নজর রেখেছে কৃষি মন্ত্রণালয় ও তার মন্ত্রী, কৃষি সম্প্রসারণ ও খামার ভবনে একাধিক শাখা বা উহং। উদ্যান ফসলের টেকসই উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে। যার কারণে দক্ষ, ফলপ্রসূত বিকেন্দ্রিকৃত, এলাকা নির্ভর, চাহিদাভিত্তিক এবং সমন্বিত কৃষি সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের মাধ্যমে সব শ্রেণীর কৃষকদের প্রযুক্তি জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ, যাতে টেকসই ও লাভজনক উদ্যান ফসল উৎপাদনবৃদ্ধি নিশ্চিত করণসহ দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন সাধিত হয়। যার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে ১৬টি সুপারিশ। সুপারিশের অন্যতম জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উদ্যান ফসল উৎপাদনে যে বিরূপ প্রভাব তা মোকাবেলায় কৃষকদের প্রয়োজনীয় কৃষি প্রযুক্তি ও পরামর্শ প্রদান শুরু হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম সাম্রাজ্য হিসেবে চিহ্নিত। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে আমের উপর কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়নি। এমনকি ফসলেও কোন হেরফের নেই। বিধায় আম নিয়ে হর্টিকালচার সেন্টারের ভিন্ন চিন্তা চেতনা কাজ করছে। এ বছরও যদি দেরিতে শীত আসায় হয়ত বা আমের মৌসুম আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। বিষয়টি আমলে নিয়ে হর্টিকালচার বিশেষ নজরদারি বাড়িয়েছে এখন থেকেই। তারা মৌসুম সহিষ্ণুজাত সম্প্রসারণে কাজ শুরু করেছে। ফল, সবজিসহ নানান ফসলের বিষয়েও মৌসুম সহিষ্ণু প্রক্রিয়া চালাতে পারলে জলবায়ু পরিবর্তনের কোন প্রভাব ফেলতে পারবে না ফল ও ফসলে। চারা সবজি ও ফসল উৎপাদনে কৌশলগত উদ্দেশ্য, কার্যক্রম, কর্মসম্পাদন সূচক এবং লক্ষ্যমাত্রসমূহ ঠিক রেখে কৃষকের নিকট উদ্যান ফসলের চারা/কলম, বীজ এবং প্রযুক্তির সম্প্রসারণ শুরু করেছে তারা আগাম। যার কারণে গত কয়েক বছরে অর্জনের পাল্টা লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। অসাধারণ সূচকের মাত্রা কোন কোন ক্ষেত্রে ৯০ থেকে ১০০ ভাগ হয়েছে। এর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কার্যালয়ের আবশ্যিক বিষয়গুলো কার্যক্রমে রূপান্তর হয়েছে। যা থেকে বেড়েছে আয়ের পরিমাণ। খেজুর গাছের বাগান ও মূল বিষয় আম বাগান নিলাম ডাকে যে অর্থ অর্জন হয়েছে তা অভাবনীয়। এক কথায় বাড়ছে আয়ের পরিমাণ। সব মিলিয়ে আবার প্রমাণিত হয়েছে এই হর্টিকালচার সেন্টারটির সেবার মান যেমন বেড়েছে তেমনি রূপান্তর হয়েছে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে। সমগ্র দেশের মধ্যে একটি সাড়া জাগানো প্রতিষ্ঠান।
লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ