কুঁড়ি থেকে ফোটা ফুলটি এখন সৌরভ ছড়াচ্ছে

6

সালটা ১৯৮৮। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যায় বিপর্যস্ত গোটা বাংলাদেশ। সেই বন্যায় দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের জেলা আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জেও জানমালের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হয়। সেই দুর্যোগে অসহায় হয়ে পড়েছিল হাজার হাজার পরিবার।
সেই সময় বন্যায় মানুষের দুর্ভোগের হাহাকার ছুঁয়ে গিয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া এক শিক্ষার্থীর মনে। তখনকার হালকা-পাতলা গড়নেরই সেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী কয়েকজন তরুণকে নিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও অসহায় মানুষদের সেবা ও সাহায্যে এগিয়ে আসেন। বিভিন্ন সংগঠন ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ সংগ্রহ করে তা বিতরণ করেন। তাদের এই কার্যক্রম সকলের কাছে প্রশংসিত হয়। আর এ কাজের মাধ্যমেই মনের মধ্যে আগামীতে সংগঠন গড়ে তোলার চারা রোপণ করে ফেলেন ত্রাণকার্যে নেতৃত্ব দেয়া সেই তরুণ। তিনি আর কেউ নন; চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কৃতী সন্তান হাসিব হোসেন।
যোগ্য পিতা আনসার হোসেনের যোগ্য সন্তান হিসেবে সমাজসেবার মানসকেই পুঁজি করে ১৯৯৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন ‘প্রয়াসে’র। বর্তমান প্রধান কার্যালয়ের নিচতলায় বারান্দা লাগোয়া একটি ছোট্ট ঘর দিয়ে ‘বিশাল স্বপ্নের’ যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রথমে এর নাম ছিল ‘প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সংস্থা’। পরে এর নামকরণ করা হয় ‘প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি। ২০০০ সালের ৭ মে সোসাইটি অ্যাক্টের অধীনে ‘প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি’ নামে নিবন্ধিত হয়, যার নিবন্ধন নং- রাজ-এস-৪৯/২০০০। এছাড়াও এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর অধীনে নিবন্ধীকরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলে ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল (নিবন্ধন নং-১৯২৩) নিবন্ধন করা হয় এবং পরবর্তীতে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) অধীনে ২০০৮ সালের ১৪ মে নিবন্ধন করা হয়, যার সনদ নং- ০০৯৭৮-০০৯৮৬-০০২৪৮।
শুরুতে মমতাময়ী মায়ের দেয়া ২ হাজার টাকাকে পুঁজি করে সামাজিক উন্নয়নের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। চালু করেন বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি; যেমন- অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন, সঞ্চয় ও ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি ইত্যাদি।
শুরুর দিকে কয়েকটা বছর জীবনসঙ্গীকে নিয়ে প্রয়াসকে একাই টেনে নিয়ে গিয়েছেন হাসিব হোসেন। পরে কাজের ব্যাপকতা বৃদ্ধির লক্ষে নিয়োগ দেয়া হয় শুরু করেন। প্রথমে নিয়োগ পেয়েছিলেন মাত্র তিনজন কর্মী; যাদের শুরুতে বেতন দেয়া হয়েছিল মাত্র ১৫০ টাকা। আর এখন তার কর্মীবাহিনীর সংখ্যা সাত শতাধিক।
শুরুতে নিজেই সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে স্যান্ডেলের শুকতলা ক্ষইয়েছেন। কখনো কখনো সুযোগ পেয়েছিলেন প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার ব্যবসায়ী বাবার মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করার। তবু দমে যাননি কর্মোদ্যমী এই মানুষটি।
তখনকার প্রয়াস আর আজকের প্রয়াসের মধ্যে ব্যবধান অনেক। তবে এটা তো অনস্বীকার্য যে, শুরুটা ভালো না হলে ‘প্রয়াস’ আজকে গড়ে উঠতে পারত না। ‘প্রয়াস’ এখন শুধু একটি সংস্থার নামই নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড়িয়েছে, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।
সৃজনশীল এই মানুষটির হাতে গড়া প্রয়াসের আর্থসামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি যে টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখছে তার উদাহরণ মেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামীণ এলাকায় নজরকাড়া বিভিন্নমুখী সামাজিক উন্নয়নের ধারা চোখে পড়লে। তার দক্ষতা ও দূরদর্শিতার ফলে প্রয়াস চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গ-ি ছাড়িয়ে অন্য জেলাতেও বিস্তৃত হয়েছে। প্রযুক্তিবান্ধব হাসিব হোসেন প্রয়াসকে আগলে রেখেছেন সন্তানের মতো, বটবৃক্ষের ছায়া হয়ে। প্রয়াসের এই উন্নয়ন যাত্রা কখনোই ভেঙে পড়ার নয়। এখানে রয়েছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের চর্চা, যা এই প্রতিষ্ঠানকে বহুযুগ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী করবে।
প্রয়াস চাঁপাইনবাবগঞ্জের আর্থসামাজিক উন্নয়নে যে ভূমিকা রেখে চলেছে, তা কোনো দিনই হারিয়ে যাবার নয়। জনগণের জীবনযাত্রার সাথে শেকড়ায়ন হয়ে গেছে এর। প্রয়াস কোথায় কোথায় বা কোন কোন ক্ষেত্রে কাজ করছে?- এ প্রশ্ন এখন অবান্তর। বরং কোন ক্ষেত্রে কাজ করছে না- সেটা প্রশ্ন না করে খুঁজে বের করাই ভালো।
মহামারি কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস মোকাবিলায়ও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল প্রয়াস। অনুদান দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলেও, যা পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) তহবিলে জমা দেয়ার মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে সৃষ্টিশীল এই মানুষটির জন্য।
সংস্কৃতিমনা মানুষ হাসিব হোসেন শুধু প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি গড়ার মধ্য দিয়ে থেমে থাকেননি। সহযোগী সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলেছেন প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট (পিএফটিআই), জেলার একমাত্র কমিউনিটি রেডিও ‘রেডিও মহানন্দা’ ও প্রয়াস হেলথ কেয়ার। প্রয়াস ফোক থিয়েটারের কার্যক্রম সারাদেশব্যাপী বিস্তৃত হয়েছে এবং সরকারি বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমে প্রায় নিয়মিত অংশ নিচ্ছে। আর রেডিও মহানন্দা তো জেলার হেঁসেলঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ‘রেডিও মহানন্দা’কে চেনাবার জন্য এখন বিশেষণ ব্যবহার করতে হয় না। নিজেও স্বাস্থ্য সচেতন। স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে অর্থনীতির চাকা ঠিক থাকবে- এই মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী তিনি। তাই প্রয়াসের উপকারভোগীদের স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি আলাদাভাবে প্রয়াস হেলথ কেয়ারও গড়েছেন।
প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি সফলতার ২৯ বছর পেরিয়ে আজ ৩০ বছরে পা রাখল। জয়তু প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি। আগামীতে এভাবেই মানুষের কল্যাণে কাজ করে এই জেলার পাশাপাশি সারা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাবেÑ এটা এখন অনেকেরই প্রত্যাশা।