করোনাকালে বাড়ছে মোবাইল-ইন্টারনেট আসক্তি : বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুর মানসিক বিকাশ

31

আখতার জাহান

করোনা ভাইরাস মানুষকে গৃহবন্দী করার সাথে সাথে ছোট শিশুদের ইন্টারনেট ও মোবাইলে বিভিন্ন গেমের প্রতি আসক্ত করে ফেলছে। উন্নত জীবনের আশায় ও পরিবারের সদস্যদের উদাসীনতায় মনের অজান্তে পরিবারের ছোট শিশুটি নিজের ক্ষতি করে ফেলছে। অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।
তথ্যপ্রযুক্তির এই শতাব্দীর সবচেয়ে উন্নত এবং কার্যকর যোগাযোগ হলো মোবাইল ফোন। বর্তমান সময়টা এমনই যে, ফোন বা ট্যাব ছাড়া শিশুকে সামলানো যায় না। না দিলেই শুরু হয়ে যায় রাগ, জিদ, চিৎকার কিংবা ভাঙচুর। এটা এমন আকার ধারণ করে, পড়তে বসতে চায় না, বাইরে খেলতে যায় না। তবে করোনাকালে শিশুরা সহজেই অতিরিক্ত হারে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে আসক্ত হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার মা-বাবাদের কাছে চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মোবাইল ফোন। সারাদেশের মতো চাঁপাইনবাবগঞ্জেও করোনাকালীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এবং অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হওয়ায় প্রায় সব বয়সের শিশুরই হাতে এসেছে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট।
অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য অভিভাবকরাও বেশির ভাগ শিশুকে ফোন দিতে বাধ্য হচ্ছেন। করোনা মহামারির কারণে শিক্ষা, চিকিৎসা ও খেলাধুলাসহ বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম মোবাইল ফোন। আর এই মোবাইল ফোন যেন কাল হয়ে উঠেছে যেন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ গঠনে। অনলাইনভিত্তিক ক্লাস হওয়ায় শিশুদের হাতে ফোন যাওয়ায় এবং অভিভাবকের অসেচতনতার কারণে শিশু কিশোররা বিভিন্ন ধরনের ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেট আসক্তি নিয়ে সদর উপজেলার কারবালা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মসিদুল হকের সাথে কথা হলে তিনি জানান, দীর্ঘদিন অনলাইনে ক্লাস নেয়া হয়েছে। তাই কমবেশি সকল শিশু-কিশোরের হাতে এসেছে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট। দেখা যায়, তারা ক্লাসের বাইরে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে একত্রে বসে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও ও গেমস নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আসক্ত হয়ে তারা প্রকৃতি ও বাস্তব জগৎ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, যা অনেকেই বুঝতে পারে না। তারা এও ভুলে যেতে বসেছে, বাইরের জগৎ বলতে কিছু আছে। তিনি আরো জানান, পড়ালেখা, খেলাধুলা, রোদ ধুলাবালি তাদের শারীরিক বিকাশে সহয়তা করে। কিন্তু মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে আসক্ত হওয়ায় এসব এখন তারা ছেড়ে দিয়েছে।
মসিদুল হক বলেন, করোনার কারণে শিক্ষার্থীরা একে অপরের সাথে মেলামেশা বা মুখোমুখি হবার কোনো সুযোগ পায়নি। যার ফলে তারা মোবাইল বা ট্যাবকেই বন্ধু বানিয়ে ফেলেছে। অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পরেছে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে আসক্ত হওয়ার ফলে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট আসক্তি কমাতে শিক্ষক ও অভিভাবককে বিশেষ নজরদারিসহ সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে
অধ্যক্ষ মসিদুল আরো বলেন, এ পরিস্থিতিতে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে বন্ধুসূলভ আচরণ করতে হবে। অনলাইন ক্লাসে নজরদারিও জরুরি। সেই সাথে অভিভাবকদের করণীয় শিশুদের ইন্টারনেট বা মোবাইল ফোন ব্যবহারে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া ও পর্যবেক্ষণ করা।
সদর উপজেলার বারঘরিয়ার নাদিরা বেগম জানান, ৮ বছর বয়সী মেয়ে সাদিয়া ফোন ছাড়া খেতে বা পড়তে বসতে চায় না। আবার পড়ালেখার পাশাপাশি মোবাইল গেমস এবং কার্টুনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। কোনো কিছু করতে বললে আবদার থাকে গেম খেলতে দেব কি না।
আরেক অভিভাবক মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার নাতি-নাতনিরা সকাল-বিকাল ফোন নিয়ে বসে থাকে। কখনো জরুরি প্রয়োজনে ফোন চাইলে না দেয়ার আগ্রহ তাদের বেশি। শুধু গেম নয় বিভিন্ন ধরনের কার্টুনও দেখে এবং ওগুলো দেখে ওদের মতো করে কথা বলার চেষ্টা করে।
সন্তানের আচরণ পরিবর্তন ও ওদের নিরাপদ বন্ধু ভেবে মোবাইল ফোন দিচ্ছেন, কিন্তু হচ্ছে উল্টো। অভিভাবকরা চিন্তার সুরে বলেন, যদি দেশে করোনা না আসত তাহলে হয়তো মোবাইল ফোন তাদের হাতে দেয়া থেকে বিরত থাকতে পারতাম। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে অনলাইনে ক্লাস হওয়ায় খানিকটা বাধ্য হয়ে তাদের স্মার্টফোন দিতে বাধ্য হয়েছি।
বিধিনিষেধের মধ্যে সারাক্ষণ ঘরে থাকায় অস্থিরতা ও বিষণœতা কাটাতে ফোন দেয়া হয়। কিন্তু এখন তারা মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ধরনের গেমসে আসক্ত হয়ে উঠেছে। ফোনই তাদের জীবন। তাদের কোনো বিষয়ে বলা হলে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না অনেক ক্ষেত্রেই মোবাইলসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিস ভাংচুর করে। অভিভাবকের মধ্যে শিশু-কিশোরদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের সচেতনতা লক্ষ করা যায় না বা হয়ে উঠে নাÑ এমনটা অভিমত সচেতন মানুষের।
মোবাইল ফোন দীর্ঘক্ষণ ব্যবহার শিশু-কিশোরদের আচরণ, মানসিক বিকাশ ও শারীরিক গঠন বৃদ্ধিতে বাধা দেয়Ñ বলছিলেন শাহ্ নেয়ামাতুল্লাহ ডিগ্রি কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মোমিনুল ইসলাম। তিনি আরো জানান, কোন সময় বাচ্চাদের মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হবে তা বাবা-মাকেই খেয়াল রাখতে হবে। কেননা মোবাইল ফোন অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়। একজন শিশুর চরিত্র গঠন ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বাবা-মা। মোবাইল ফোনের পাশাপাশি তাদেরকে বাইরের জগৎ সম্পর্কে চেনাতে হবে, বিশেষ করে যে বাচ্চাটা প্রাথমিকে ভর্তি হবে বা হচ্ছে। বইয়ের পাতায় আঙুল দিয়ে পড়াতে হবে। আমরা বাচ্চাদের সবকিছু শেখাব কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।
মোমিনুল ইসলাম অভিভাবকদের উদ্যেশ্যে আরো বলেন, ছোট শিশুরা কাদামাটির পুতুলের মতো। একটা লোহাকে যখন গরম করা হয়, তখন তাকে যেদিকে আঘাত করা হয় সেদিকে বসে যায়। তাই মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট থেকে শিশুকে রক্ষা করতে এবং শিশুর সঠিক মানসিক বিকাশ গঠনে মা-বাবাকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ।

আখতার জাহান : ফেলো, রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম