কমিউনিটি রেডিওঃ কিছু সহজ কথা

143

সাবরিনা শারমিন

FB_IMG_1455266833005

মাত্র কয়েক বছর আগেও এটি ছিল স্বপ্নের মতো। প্রত্যন্ত গ্রামের সহজ সাধারণ মানুষ। যে মানুষগুলোর খেয়ে পড়ে প্রতিদিন বেঁচে থাকাটাই একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ, তাদের কথা কিনা ইথারে ভেসে ভেসে ছড়িয়ে যাচ্ছে এক প্রান্ত থেকে অন্য আরেক প্রান্তে। যে মেয়েটি পাঁচজন মানুষের সামনে নিজের কথা বলতে পারবে এমনটা কখনোই ভাবতে পারেনি, সে আজ স্টুডিওতে বসে মাইক্রোফোনের সামনে নিজের নামটি ঘোষণা করে নিজের সরব অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। দৈনিক শ্রম বিক্রি করে খাওয়া যে মানুষটি নিজের অজান্তেই কন্ঠ খুলে গেয়ে উঠেছে অসংখ্যবার, কিন্তু কখনো ভাবেনি যন্ত্রের ভেতর দিয়ে একদিন ভেসে আসবে তার কণ্ঠস্বর, সেও আজ রেডিও শিল্পী। এমনই সব সাধারণ মানুষদেরকে সঙ্গে নিয়ে, এঁদের ইচ্ছাপূরনের গল্প লিখে চলেছে বাংলাদেশের কমিউনিটি রেডিওগুলো।
এদেশে কমিউনিটি রেডিও এখন আর নতুন কোনো শব্দ নয়। বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিও এখন একটি পরিচিত ও জনপ্রিয় গণমাধ্যম। প্রান্তিক জনপদের মানুষদেরকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধা দেয়ার যে লক্ষ্য নিয়ে এই রেডিওর যাত্রা শুরু হয়, রেডিওগুলো সে লক্ষ্যপূরণে এগিয়ে গেছে। কি হবে কেমন হবে ধরনের অনিশ্চয়তা নিয়ে চলতে চলতেও বাংলাদেশে এখন কমিউনিটি রেডিওর সংখ্যা ১৭টি।
একটু যদি পেছনে ফিরে তাকাই, ঠিক সেই মুহূর্তটিতে যখন ১২টি সংস্থা কমিউনিটি রেডিও স্থাপনের সরকারি অনুমোদন পেল। কমিউনিটি রেডিওর বাস্তব পথচলা আসলে শুরু হয়েছিলো ২০০৮ সালে। এ বছর বাংলাদেশ সরকারের কমিউনিটি রেডিও স্থাপনের আবেদনপত্র আহ্বানের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০১০ সালের এপ্রিল মাস। কমিউনিটি রেডিও স্থাপনের জন্য সরকারি অনুমোদন পেল ১২টি উন্নয়ন সংস্থা। পরে আরো দু’টি মিলিয়ে মোট ১৪টি। ব্র্যাক, আরডিআরএস বাংলাদেশ, ইয়ং পাওয়ার ইন সোস্যাল একশন (ইপসা), ম্যাসলাইন মিডিয়া সেন্টার, প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি, সেন্টার ফর কমিউনিকেশন এন্ড ডেলেলপমেন্ট (সিসিডি) বাংলাদেশ, সৃজনী বাংলাদেশ, এলায়েন্স ফর কোঅপারেশন এন্ড লিগ্যাল এইড বাংলাদেশ (একলাব), ল্যান্ডলেস ডিসট্রেসড রিহেবিলিটেশন অর্গানাইজেশন (এলডিআরও), এনভায়রনমেন্ট কাউন্সিল (ইসি) বাংলাদেশ, নলতা হসপিটাল এন্ড কমিউনিটি হেলথ ফাউন্ডেশন, ব্রডকাস্টিং এশিয়া বাংলাদেশ, নওগাঁ হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রনালয়ের অধীনে একটি রেডিও। সরকারের অনুমোদন প্রদানের খবরটি সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা ১৪টি সংস্থাকে একটি পরিবারের আদল দিল। সকলে মিলে একই ভাবনা, একই প্রচেষ্টা, কীভাবে আমরা একটি করে সুন্দর কমিউনিটি রেডিও স্টেশন বানাবো।
এদেশে কমিউনিটি রেডিও নিয়ে কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা তখনও কারো নেই। তাত্বিক জ্ঞান আছে, আছে নির্দেশনামূলক একটি সরকারি পলিসি, কারো কারো প্রতিবেশী দেশগুলোর কমিউনিটি রেডিও পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা আছে। ব্যস, এই আমাদের ভরসা। মাঠে কাজ করতে গিয়ে মনে হলো আমাদের সামনে বাতিঘর তো আছে, কিন্তু সেখানে পৌঁছুবার সহজ কোনো পথ যেন জানা নেই। কি যে এক অবস্থা তখন! নিজেরা নিজেদের সঙ্গে পরামর্শ করি। যাদেরকে দিকপাল বলে মনে হয় তাদের কাছে প্রতিদিনই বুদ্ধি নেই। এখানে যাই, ওখানে যাই। আনন্দ যেমন ছিলো, তেমনি আবার অনভিজ্ঞতার উৎকণ্ঠা আমাদের স্বপ্নের ওপর মাঝে মাঝে ছায়া ফেলতো। কিন্তু অনভিজ্ঞতা আমাদেরকে হতোদ্যম করতে পারে নি। আমরা আমাদের স্বপ্নের ফুল ফুটিয়েছি।
কমিউনিটি রেডিও নিয়ে কাজ করবার অভিজ্ঞতা আমার পেশাগত জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি অভিজ্ঞতা। কমিউনিটি রেডিও নিয়ে যখন এদেশে অনেক আলাপ-আলোচনা চলছিল তখন বিষয়টি ছিলো এক ধরনের। এরপর অনুমোদন প্রাপ্তির যে বিভিন্ন ধাপ একে একে পার করছিলাম সে ছিল আর এক ধরনের অভিজ্ঞতা। আর যখন এটি নিয়ে সত্যি সত্যিই মাঠে নামলাম তখনকার চিত্র, তখনকার যে অভিজ্ঞতা তা একেবারেই ভিন্ন। প্রত্যেকটি ধাপই ছিলো চ্যালেঞ্জিং। প্রত্যেকটি ধাপের এক একটি চ্যালেঞ্জ জয় করবার আনন্দও ছিল অপরিসীম। কমিউনিটি রেডিও নিয়ে কাজ করার দায়িত্বটি যখন পেলাম তখন শুধু যে দায়িত্ব পালনের তাগিদ থেকে এই কাজটি করলাম তা নয়। এই কাজটির সঙ্গে আমার ভালোলাগা জড়িয়ে ছিলো। একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির সঙ্গে একীভূত হতে পারার আনন্দ গণমাধ্যম নিয়ে আমার পড়াশুনার অভিজ্ঞতাকেও আনন্দময় করে তুলেছিলো।
যাত্রা শুরুর দিনগুলোতে যেন কমিউনিটি রেডিওর আলাদা কোনো পরিচয় ছিলো না। প্রতিষ্ঠিত অবকাঠামোগুলোর কাছে স্বীকৃতির স্পষ্ট অভাব ছিলো। মাঝে মাঝে মনে হতো আমাদের অস্তিত্ব অন্য কোথাও মিশে যাবে না তো? স্বাভাবিক ভাবেই সেই দিনগুলোতে আমাদের ভুল-ত্রুটি হতো বেশি। সবদিক সামলে রেখে সম্প্রচার নীতিমালার প্রত্যেকটি অনুচ্ছেদের হিসেব মিলিয়ে রেডিও পরিচালনা করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত কিছু বিচ্যুতিও হচ্ছিল। এই ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে অনেক মহল থেকে আমাদেরকে তুলোধুনো করা হতে থাকলো। সম্ভাবনার কথা যেমন হলো, তেমনি অনেক বেশি নেতিবাচক সমালোচনাও হতে লাগলো। অন্যান্য অনেক ধরনের প্রারম্ভিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি এই চ্যালেঞ্জটিও আমাদেরকে সামলে নিতে হয়েছে। তবে এসব সমালোচনা-আলোচনা কমিউনিটি রেডিওগুলোর দৃশ্যত: দুটো বড় উপকার করে। এক. রেডিওগুলো সামগ্রিকভাবে পরিচিতি পায়; দুই. শুরুতেই রেডিওগুলো নিজেদের স্বকীয়তা রক্ষায় সচেতন হয় ও ভিন্নধারার সম্প্রচার মাধ্যম হিসেবে নিজেদের জায়গাটি স্পষ্ট করে নেয়।
বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিওর যাত্রা মাত্র ৪/৫ বছরের। এই অল্প সময়ের যাত্রায় যা কিছু অর্জন হয়েছে তা খাটো করে দেখবার কোনো সুযোগ নেই। কমিউনিটি রেডিওগুলো নিজ নিজ এলাকায় তথ্য বিনোদনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এক সময় সহজ সাধারণ মানুষের কাছে গণমাধ্যম, বিশেষ করে সম্প্রচার মাধ্যম ছিলো কল্পনা ও বাস্তবের মিশেলে তৈরি অদ্ভুত এক কাল্পনিক অবয়ব। ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা এসব প্রচলিত ধারার গণমাধ্যমে গিয়ে নিজেদের কথা নিজেদের মতো করে বলে আসবে এমনটা তারা কখনোই ভাবতে পারেনি। গণমাধ্যমকে এই সহজ সাধারণ মানুষগুলোর হাতের নাগালে এনে দিয়েছে কমিউনিটি রেডিও। গণমাধ্যম এখন আর কল্পনা ও বাস্তবের মিশেলে তৈরি অদ্ভুত কোনো অবয়ব নয়। নিজের কথা নিজের মতো করে বলতে পারার এক সহজ মাধ্যম হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে কমিউনিটি রেডিওগুলো।
বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিও আন্দোলনে আমরা যদি হই সেনাদল, বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও এন্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)’কে আমি তবে সে দলের সেনাপতি মনে করি। বিএনএনআরসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব এএইচএম বজলুর রহমান (আমাদের কাছে বজলুর ভাই)-এর কথা সেক্ষেত্রে যতো বেশিই বলিনা কেন, আসলে কমই বলা হবে। সকাল নেই, সন্ধ্যা নেই, তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ে যখনই মনে করেছি বজলুর ভাইকে ফোন করেছি, ওনার পরামর্শ নিয়েছি। উনি কখনও বিরক্ত হন নি। শুরুর সেই দিনগুলিতে বজলুর ভাই আমাদের পাশে থেকেছেন একজন সাহসী সেনাপতির মতোই।
রূপান্তরের প্রশিক্ষণের দিনগুলোও আমার জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। শিল্পানুরাগী এই সংস্থাটি কমিউনিটি রেডিওর নিরন্তর যুদ্ধের কঠিন সময়টিতে নিশ্চুপ বসে থাকেনি। রূপান্তর তাদের সামর্থ্য নিয়ে সদ্য অনুমোদনপ্রাপ্ত কমিউনিটি রেডিওগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে। তখনও কোনো স্টেশনই কর্মী নিয়োগ করেনি। তাই তখনকার প্রশিক্ষণগুলোতে সংস্থার নির্বাহী প্রধান অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই অংশগ্রহণ করতেন। স্টেশন প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে এটার প্রয়োজনও ছিলো। স্ক্রিপ্ট লেখা থেকে শুরু করে, ভয়েস দেয়া, রেকর্ডিং ইত্যাদি শেষে একটি পুরো প্রোগ্রাম বানাতে পারার আনন্দ রাত জেগে কাজ করার কষ্টকে ছাপিয়ে গিয়েছিলো। কষ্টটা আসলে অনুভবই করতে পারিনি। শুধুই কি রেডিও প্রোগ্রাম বানাতে পারার আনন্দ! এই প্রশিক্ষণগুলো আমাদের মাঝে সংযোগ তৈরি করেছে। কাজের ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের হাত সম্প্রসারিত হয়েছে।
রূপান্তরের মাধ্যমেই ভারতে যাওয়া হলো ওখানকার কমিউনিটি রেডিও স্টেশন পরিদর্শনে। ওখানকার স্টেশন পরিদর্শনের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেশে ফিরে নিজেদের স্টেশন বানানোর পরিকল্পনায় কাজে লাগানোই ছিলো এই সফরের লক্ষ্য। অত্যন্ত কার্যকর ও সফল একটি সফর ছিলো এটি। এই পরিদর্শন আমাকে সাহায্য করলো রেডিও চিলমারীর জন্য একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা তৈরি করতে। অবকাঠামো পরিকল্পনা, অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, আর্থিক পরিকল্পনা সবকিছুতেই বাস্তব ভূমিকা রেখেছে এই সফরের অভিজ্ঞতা।
আজ যখন এই লেখাটি লিখছিলাম তখন বারবার নস্টালজিক হয়ে পড়ছিলাম। কমিউনিটি রেডিও নিয়ে চ্যালেঞ্জিং সময়গুলো মনে পড়ছিলো। আর কাকতালীয়ভাবেই রেডিও মহানন্দার তিন বছর পূর্তির সংখ্যাটিও তখনই আমার হাতে এলো। হাসিব ভাই (রেডিও মহানন্দা’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাসিব হোসেন) খুব সুন্দর করে কমিউনিটি রেডিও’র মুহূর্তগুলোকে গুছিয়ে উপস্থাপন করেছেন। রেডিও মহানন্দার বিশেষ সংখ্যাটি আমার এই লেখাটিকে আবেগতাড়িত করেছে। বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিওকে এগিয়ে নেবার কাজটি সহজ বা সংক্ষিপ্ত ছিলো না। আমাদের একসঙ্গে পথচলা, একসঙ্গে কাজ করা, একসঙ্গে নিজেদের উদ্বেগ ও আনন্দ ভাগ করে নেবার মুহূর্তগুলোর বাস্তব অবয়ব আজকের কমিউনিটি রেডিও। সব ধরনের চ্যালেঞ্জকে সঙ্গে করেই কমিউনিটি রেডিওগুলো এগিয়ে চলেছে সাধারণের হাত দিয়ে সাধারণের কাছে।
একসঙ্গে থাকা মানে কঠিন কাজটি সহজ করে করতে পারা। একসঙ্গে থাকা মানে নিজের অবস্থানে শক্তভাবে দাঁড়াতে পারা। নিজের চাওয়ার কথাটি বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলতে পারার জন্য একত্রিত হয়ে থাকাটা প্রয়োজন। এই প্রয়োজনকে উপলদ্ধি করেই ২০১৪ সালে বাংলাদেশ কমিউনিটি রেডিও এসোসিয়েশসন-এর কার্যক্রম শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যে এসোসিয়েশন গঠন করতে পারা কমিউনিটি রেডিওর একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কমিউনিটি রেডিওগুলোকে নিজেদের প্রয়োজনেই এই এসোসিয়েশনটিকে আরো বেশি শক্তিশালী করতে হবে। একে কার্যকর রাখতে হবে।

(লেখক: যোগাযোগ সমন্বয়কারী, আরডিআরএস বাংলাদেশ; সদস্য, ব্যবস্থাপনা পরিষদ, রেডিও চিলমারী; সদস্য, কার্যনির্বাহী পরিষদ, বাংলাদেশ কমিউনিটি রেডিও এসোসিয়েশন)