এত প্রিয়জন একসাথে হারাবার পরও কি করে শক্ত থাকব…

41

মৌটুসী চৌধুরী

“সকালটা ছিল অনেক সুন্দর। মনে একটা আনন্দ কাজ করছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে নতুন বৌকে নিয়ে যাবে নিজের বাড়ি। কত আয়োজন চলছে- রান্না, খাওয়া-দাওয়া। নদীর ওপার থেকে সবাই যে আমাদের আনতে আসছে। কিন্তু একটা রশ্মি, একটা বিকট শব্দ সব আনন্দকে বিষাদে পরিণত করে দিল।”
বাবার কবর ঠিক করতে করতে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন নতুন বর মামুন।
“আমার বাড়িতে মানুষজন ঠিকই আছে; কিন্তু কেউ সুখে বা আনন্দে নয়, সবাই এসেছে শোকে সান্ত¦না দিতে। এইরকম তো হওয়ার কথা ছিল না। তবে আল্লাহ কেন করল এমন? কত পরিবারকে ধংস করে দিল।”
৩১ জুলাই বিয়ে হয়েছিল তার। চার দিন পর অর্থাৎ ৪ আগস্ট তাদের আয়োজন করে আনার কথা ছিল।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মায়ের সাথে কথা হলে মা বলল, সবাই বের হয়ে গেছে। আমিও মুখ ধুয়ে বসে আছি সবাই আসবে তখন সবার সাথে বসে খাবার খাবো। কিন্তু হঠাৎ একজন এসে বলে যে, এই বাড়ির বিয়ের নৌকায় বিজলি পড়ে ২ জন মারা গেছে। এ কথা শুনে আমরা ৩ জন দৌড়ে গিয়ে দেখি, ২ জন না অনেক মারা গেছে। প্রথমেই দেখি আমার আব্বা আর দুলাভাইকে। সবাই মাটিতে শুয়ে আছে। পরে সবাই দৌড়ে এসে যাদের জ্ঞান আছে তাদের অন্যরা তুলে নৌকায় করে এপারে নিয়ে আসছে। আমার আব্বা আর দুলাভাইকে নিয়ে অন্য নৌকায় নিয়ে যাওয়া হলো। বাড়ি এসে আমি ভেঙে পড়ি।
একজন এসে বলল, আমার আব্বা বেঁচে আছে। এটা শুনে মনে কিছুটা স্বস্তি এলেও কিছুক্ষণ পর শুনলাম আব্বা আর দুলাভাই বেঁচে নেই। এরপর নিজেকে সামাল দেয়াটা ছিল জীবনের সব থেকে বড় কষ্টের। পরে জানতে পারলাম আমার নানা-নানি, চাচা, চাচাতো ভাই, মামা-মামি, দুলাভাই, ফুফু, ফুফাতো ভাই অনেককেই হারিয়ে ফেলেছি। এই সময় সবাইকে নিয়ে আমার হাসিখুশি থাকার কথা, অথচ এখন আমাকে আব্বার কবর ঠিক করতে হচ্ছে। কখনো চাইনি, এভাবে নিজ হাতে সারা রাত লাশ পাহাড়া দিয়ে আব্বাকে দাফন করতে হবে।
নিজের আত্মীয়-স্বজনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মামুন। তারপরও মামুন বলেন, আমার মায়ের পাশে আমি আছি; কিন্তু আমার আপার পাশে এই মুহূর্তে দাঁড়াতে পারছি না। সব থেকে খারাপ লাগছে আমার ফুফাতো ভাই আর মামাতো ভাই-বোনদের জন্য। ওদের কেউ থাকল না। আমি যে ওদের কাছে গিয়ে দাঁড়াব সেই শক্তিটুকু আমার নাই। মামাতো ভাই-বোনেরা অনেক ছোট, তাদের দেখার মতো কেউ নাই। আমি আমার নানার বাড়ি যেতেই পারছি না, একসাথে এত কবর আমি সহ্য করতে পারব না। এভাবে সবাইকে হারিয়ে দিব তাও আবার একসাথে, তা কখনো ভাবতে পারি না। কাকে হারাবার সান্ত¦না দিব নিজেকে। এত প্রিয়জন একসাথে হারাবার পরও কি করে শক্ত থাকব আমি। তারপরও নিজেকে শক্ত করে রেখেছি। এখন আকাশে সামান্য একটু মেঘ দেখলেই কলিজা কেঁপে উঠে। ভয়ে ঘরের বাইরে বের হয় না।
‘সরকারি কোনো সহযোগিতা পেয়েছেন কিনা’ এমন প্রশ্নের উত্তরে মামুন বলেন, কতটুকু সাহায্য করবে? জেলা প্রশাসন থেকে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছে দাফনের জন্য। তাতে আর কি হয়। বড় শখ করে সবাইকে আমার বিয়েতে নিয়ে গিয়েছিলাম। মা বলেছিল, আর কখনো হয়তো আমার আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে যেতে পারব কিনা তাই আমার আপনজনদের সবাইকে নিয়ে গিয়েছিলাম। ৪০ থেকে ৫০ জন ছিল। সেই শখ আমার সারা জীবনের ইতিহাস হয়ে থাকল।
শুধু মামুন না, তার মতো আরো অনেকে আছে যারা তাদের বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। সেইসব পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াবার মতো আর কেউ নেই। একই পরিবারে ৭ জন হারানোয় গ্রামবাসী নিজে থেকে রাস্তায় চলাচলকারী সবার কাছে চাঁদা তুলে সেই অসহায় পরিবারের হাতে তুলে দিচ্ছে। কত অসহায় হলে মানুষের জীবন এমন দুর্বিষহ হয়ে উঠে তা এই পরিবারগুলোকে না দেখলে বোঝা যায় না।
উল্লেখ্য, গত ৪ আগস্ট জেলার সদর উপজেলার নাারয়ণপুর ইউনিয়নের জনতার হাট এলাকা থেকে বিয়ের অনুষ্ঠানে পার্শ্ববর্তী পাঁকা ইউনিয়নের দক্ষিণ চরপাঁকায় বেশ কিছু লোক নৌকা যোগে যাচ্ছিল। নৌকা থেকে নামার পর বৃষ্টি শুরু হলে তারা ওই ঘাটের ইজারাদারের টিনের ছাউনিতে আশ্রয় নেয়। দুপুর ১২টার দিকে ওই ঘাটে থাকা অবস্থায় বজ্রপাত হলে ছাউনির ভেতরে থাকা লোকদের মধ্যে অন্তত ১৬ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং একজন এই ঘটনা দেখতে এসে হার্ট আ্যাটাক করে মারা যান।