এটা কি প্রকৃতির প্রতিশোধ?

29

জাহাঙ্গীর সেলিম

খ্রিষ্টীয ২০২২ নববর্ষের প্রথম মাসের ১২ তারিখ। কুয়াশার মধ্যে ঢাকা পড়ে সকালের সূর্য। আধা মেঘে ঢাকা আকাশ, ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের লুকোচুরি এবং সেভাবেই কাটে সারাদিন। আবহাওযার পূর্বাভাসে বলা হয়- হালকা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হতে পারে। এ দিন আশপাশের কোনো কোনো স্থানে ইতোমধ্যে মোটামুটি বৃষ্টি হয়েছে। অসময়ে বৃষ্টিতে প্রায় সবার মুখে তৃপ্তির হাসি। কিন্তু রাত দশটার দিকে হালকা বাতাসের সাথে বৃষ্টির মধ্যেই অসময়ে শুরু হলো শিলাবৃষ্টির তা-ব। এক সময় বৃষ্টির চেয়ে শিলার পরিমাণ বেড়ে যায়। তারপর থেকে মাঝেমধ্যে ভারী বৃষ্টি। অঝোরে ঝরতে থাকে ৫-৭ মিনিট ধরে শিল, সঙ্গে দমকা বাতাস ও মাঝারি বৃষ্টি আধা ঘণ্টাব্যাপী। পরদিন সকালে বাড়িঘরের আশপাশ, আঙ্গিনা, গ্রামীণ মেঠোপথে জমে থাকা স্তূপীকৃত বরফের ছড়াছড়ি। গাছের পাতা ঝরে জমিন ঢেকে দেয়, অনেক ধরনের গাছ পাতাশূন্য হয়ে পড়ে। শাকসবজির ক্ষেত ল-ভ- হয়ে পড়ে। ফলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক। কোনো কোনোখানে বেলা ১১টার পরেও জমাটবাঁধা বরফ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
এ অবস্থা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আংশিক স্থানে, যা ইতোপূর্বে বা সুদূর অতীতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি বলে জানা যায়। ফলে বয়স্ক লোকজনদের কাছে শুধুই বিস্ময়। বিস্ময় ও আনন্দ সমভাবে বর্তমান প্রজন্মের কাছেও। তারা আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে শীতকালে পৃথিবীর অনেক দেশে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট তুষারপাতে ছেয়ে যেতে দেখেছে। আরও প্রত্যক্ষ করেছে, সেসব দেশের ছেলেমেয়েরা বরফ নিয়ে খেলা করে এবং একে অন্যের প্রতি ছোড়াছুড়ি করার ছবি। কিন্তু আমাদের দেশে শিলাবৃষ্টি বরফের মতো জমাট বেঁধে যাবে তাদের কল্পনারও অতীত। ফলে পরের দিন সকালে পা দিয়ে লাথি মেরে বরফ ভেঙ্গে হাতে তুলে আনন্দ করতে মেতে ওঠে, এদিক ওদিক চালাচালি করতে দেখা যায়। এটিই তাদের জন্য মধুর স্মৃতি।
অন্যদিকে আশপাশের বেশ কিছু পড়শী, যাদের ছাপড়া টিনের ঘরে বসবাস (গ্রামে অধিকাংশ একচালা টিনের বাসগৃহ) তাদের নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে বাধ্য হয়েই। টিনের ওপর শিলা আটকা পড়ে বরফ জমে, বৃষ্টির পানিও আটকা পড়ে। ফলে টিনের ফাঁক বা পেরেকের পাশ দিয়ে পানি চুঁইয়ে ঘরের মধ্যে লেপ, কাঁথা, বালিশ ভিজে একাকার হতে থাকে। সেগুলো অনেক চেষ্টা করে রক্ষা করতে পারেনি। শিলাবৃষ্টি থামার পর কেউ কেউ চালায় উঠে জমাট বাঁধা বরফ ছোট করে ভেঙে নিচে নামাতে চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি যা হবার তা হয়ে গেছে।
চৈতালি ফসল ও শাকসবজির ক্ষেতের ওপর দিয়ে সুনামি বয়ে যায়। এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তার কাছ থেকে জানা যায়, তার ক্ষেতের করুণ চিত্র। সপ্তাহখানেক আগে তার বরই বাগান ৮ লাখ টাকায় কিনে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু আরও বেশি লাভের আশায় বিক্রি করেনি, এখন এক লাখ টাকারও বরই গাছে নেই।
বছর পাঁচেক আগের কথা। ভাদ্র মাসের কোনো এক রাতে মুষলধারে বৃষ্টি নামে। কিন্তু বৃষ্টি আর থামে না। সকালে দেখা গেল যতসব খাল, ডোবা, পুকুর, ছোট জলাশয়, রাস্তা পানিতে থৈ থৈ করছে। কিন্তু কী পরিমাণে বৃষ্টি হলো জানার কোনো ব্যবস্থা নেই। একইভাবে কি পরিমাণে শিল পড়ল তাও জানা যাবে না। তবে কেউ কেউ মনে করেন, শিল পড়ার পরিমাণ ২-৩ ইঞ্চি হতে পারে।
এই জেলায় অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, উষ্ণতা, শীতের প্রকোপ ইত্যাদি প্রতি বছর কোনো না কোনোভাবে দৃশ্যমান। কিন্তু সেসব পরিমাপের জন্য আবহাওয়া দপ্তরের কোনো রেকর্ড স্টেশন নেই। উন্নয়নের ঢাকঢোল যতই পিটানো হোক না কেনÑ এসব ছোটখাটো অবকাঠামো নির্মাণ করে জনগণকে আগাম সতর্ক প্রদান করে দুর্ভোগ কমিয়ে আনা কী সম্ভব নয়? তা চলতি সময়টা ভরা সবজির সময়। বিভিন্ন শীতের সবজিতে মাঠভর্তি। প্রতিদিন মাঠ থেকে সবজি বাজারে আসে। এ দুর্যোগের ফলে স্থানীয় বাজারে সবজির সরবরাহে ঘাটতি দেখা যেতে পারে। সরবরাহ কমে যাওয়া মানে মূল্যবৃদ্ধি। সবজি অন্য স্থান থেকে সরবরাহ হবে। কিন্তু চাষিদের দুর্ভোগ ও ক্ষতি কী ভাবে পুষিয়ে নেবে?
অশনি সংকেত মনে হয় সামনে অপেক্ষা করছে। মাসখানেকের মধ্যে তার প্রতিফলন দৃষ্টিগোচর হতে পারে। আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে আমগাছে মুকুল দেখা যাবে। কিন্তু যেসব ডালে মুকুল ধরে সে ডাল থেকে অধিকাংশ পাতা ঝরে পড়েছে, সদর উপজেলার মহারাজপুর থেকে শিবগঞ্জ পর্যন্ত। পূর্বদিকে বালিয়াডাঙ্গা এবং মহানন্দার পশ্চিম পাড় দিয়াড়ের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এই তা-ব। ফলে এলাকার আমবাগানে মুকুল প্রস্ফুটিত হওযা নিয়েই শঙ্কা। অনিশ্চিত মধুমাসে আম, জাম, কাঁঠাল ও অন্যান্য ফল নিয়ে।
উল্লেখ্য, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অর্থনৈতিক ভিত হলো কৃষি এবং উৎপাদনে উদ্বৃত্ত। কৃষি উৎপাদনে রয়েছে বৈচিত্র্যের সমারোহ। বরেন্দ্র এলাকায় রুক্ষ, বৈরী প্রকৃতি, বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি এবং অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা সত্ত্বেও কৃষি উৎপাদনে ধারাবাহিক সাফল্য। কিন্তু এ সফলতা মুখ থুবড়ে পড়ার মতো অশনি সংকেত উড়িয়ে দেয়া যায় না। বরেন্দ্র এলাকায় সেচের পরিধি ক্রমাগত বাড়তে থাকার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থানবিশেষে দ্বিতীয় স্তরেও অনেক স্থানে অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। ডাসকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত সমীক্ষায় জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঝিলিম ইউনিয়নে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পানির স্তর ছিল ১০২ ফুট নিচে। ২০১৭ সালের ফেব্রুযারিতে ১০৮ ফুট ৯ ইঞ্চি নিচে নেমে যায়। এক যুগ আগে এসব এলাকায ৬০ থেকে ৯০ ফুট গভীরে পানির স্তর ছিল (সূত্র সংবাদ, ০৪.০৩.২০১৭)। আংশিক সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত বরেন্দ্রর কিছু জমিতে তিন ফসল প্রধানত ধান চাষে আগ্রহী কৃষকরা। মটিভেশনের ফলে একবার ধানসহ রবিশস্য উৎপাদনে আগ্রহ বেড়েছে।
উল্লেখযোগ্য হলো, ভূসম্পত্তি পরিবারের শিক্ষিত যুবকরা কৃষিকাজে উদ্যোক্তার ভূমিকায মাঠে নেমেছে। এসব উদ্যোক্তারা ধানের পরিবর্তে আম, পেয়ারা, বরই, মালটা, কমলা ও রবিশস্য উৎপাদনে আগ্রহী। গরুর খামারও করেছে, কিন্তু তারা নানা সমস্যায় জর্জরিত। কয়েকজন উদ্যোক্তার সাথে আলাপে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট কৃষি দপ্তরের দুর্বল কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা, সম্প্রসারণ সুবিধা অপ্রতুল এবং প্রশিক্ষণের মান নিয়ে তারা বিরক্ত। অন্যদিকে সরকারের লক্ষ্য বরেন্দ্র তথা উত্তরাঞ্চলে বছরে একবার ধান ও রবিশস্যসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান। লাভের কথা চিন্তা করে অনেক তরুণ আম, পেয়ারা, বরই, মালটা, ড্রাগনসহ অন্যান্য বাগান গড়ে তুলেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় তরুণ উদ্যোক্তারা চাহিদামতো কারিগরি জ্ঞান, লাগসই প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় উপদেশ ও অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সংশ্লিষ্ট কৃষি দপ্তর এ ব্যাপারে তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে উপযুক্ত পরামর্শ ও কারিগরি জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
Everything is borrowed from our future, অতি মূল্যবান কথা, তিন দশকেরও আগে থেকে একথা শোনা যাচ্ছে। আমাদের দেশে কি এর ন্যূনতম প্রয়োগ রয়েছে বা আছে? শহর নগর গ্রামগঞ্জের ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার দেখেই এর যথার্থতার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাটের মহোৎসব চলছে শহর-নগর গ্রামগঞ্জে। বনজসম্পদের পরিমাণ বিবেচনায় দেশের অবস্থা শোচনীয়। বনভূমি উজাড় করে শিল্প স্থাপন করা হচ্ছে এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টির সহায়ক হিসেবে আমাদের কর্মকা- সম্প্রসারিত। মনে রাখা দরকার, দেশে বা পৃথিবীতে বিরাজমান যে সম্পদ সেগুলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে শুধু ভাবলে চলবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও সেসব সম্পদের অধিকার রয়েছে। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে এই নিয়ম চলে আসছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে চিহ্নিত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় রক্ষাকল্পে ব্যবস্থা গ্রহণে সদ্য সমাপ্ত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে পৃথিবীর প্রায সব দেশের সরকার প্রধানদের উপস্থিতি সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঐকমত্য সৃষ্টি হয়নি। যদিও বিশ্বব্যাপী উন্নত ও অনুন্নত দেশগুলো সমানভাবে জলবায়ুর প্রভাবের তা-বলীলা প্রতি বছরই লক্ষ করছে, আমরাও এর মূল্য দিচ্ছি। আমাদের দেশে সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে আমরা ক্ষতি পুষিয়ে নেব কি ভাবে?

জাহাঙ্গীর সেলিম : কলাম লেখক ও গবেষক