একুশে পদকপ্রাপ্ত বাচ্চু ডাক্তারের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আগামীকাল

24

চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদ সদস্য, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভাষা সৈনিক ডা. আ.আ.ম. মেসবাহুল হক (বাচ্চু ডাক্তার)-এর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আগামীকাল সোমবার। ২০০৯ সালের ১৬ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন
এ উপলক্ষে মেসবাহুল হক বাচ্চু ডাক্তার স্মৃতি পরিষদ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় বাচ্চু ডাক্তার সড়কে মরহুমের বাসভবন হক মঞ্জিলে কোরআনখানি ও দোয়া মাহফিল এবং বাদ আসর মিলাদ মাহফিল। বেলা ১২টায় বালিয়াডাঙ্গা কবরস্থানে মরহুমের কবর জিয়ারত।
উল্লেখ্য, তৎকালীন নবাবগঞ্জ মহকুমার (বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার) সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৩০ সালের ৩ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন এই রাজনীতিবিদ। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য ২০২০ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।
ডা. আ. আ. ম. মেসবাহুল হক ১৯৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলার মালদহ জেলার জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৪৯ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আই.এস.সি. এবং ১৯৫২ সালে রাজশাহী মেডিকেল স্কুল (বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ) থেকে এল.এম.এফ. ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৪৭ সালে ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে কেন্দ্রের নির্দেশে আসাম প্রদেশের সাথে সিলেট জেলাকে অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য সিলেটে জনমত সৃষ্টির লক্ষে সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেন। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান রাজশাহী সফরে এলে রাজশাহী কলেজের ছাত্ররা তাকে স্মারকলিপি প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রীকে ডেপুটেশন প্রদানের কথিত অপরাধে ডাক্তার বাচ্চুসহ ১৬ জন ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়।
ডা. আ. আ. ম. মেসবাহুল হক রাজশাহী মেডিকেল স্কুলে অধ্যয়নের সময় ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে মহান ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে রাজশাহী কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসের গেটে ইট কাদা দিয়ে দেশের প্রথম শহীদ মিনার তৈরিতে অংগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার অপরাধে তিনিসহ ৪০ জন ছাত্রনেতা কারাবরণ করেন। বাচ্চু ডাক্তার তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে ৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং আশির দশকের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণ করেন।

তিনি ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকে সংগঠিত করা এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের গৌড় বাগান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের তিনি ইনচার্জ ছিলেন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালে মালদহে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রবাসী সরকার প্রতিষ্ঠিত জোনাল অফিসের তিনি সহকারী চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ডা. আ. আ. ম. মেসবাহুল হক (বাচ্চু ডাক্তার) বাংলাদেশের গণপরিষদ সদস্য (১৯৭২-১৯৭৩) নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭২ সালে প্রথম হস্তলিখিত সংবিধানে স্বাক্ষরকারীদের একজন। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাচ্চু ডাক্তার চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ এর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গভর্নর নিযুক্ত করেন।
তিনি একজন সমাজসেবক ছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জস্থ রেডক্রস সমিতি, ডায়াবেটিক সমিতি, হার্ট ফাউন্ডেশন, অন্ধ কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়াও তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জস্থ সাধারণ পাঠাগার, টাউন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, সহসভাপতি এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ, নবাবগঞ্জ মহিলা সরকারি কলেজ, নবাবগঞ্জ শিশু শিক্ষা নিকেতন, জেলা স্কুল, বালিয়াডাঙ্গা সিনিয়র মাদ্রাসা, নবাবগঞ্জ কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাথে জড়িত ছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ডা. আ. আ. ম. মেসবাহুল হক দীর্ঘ মেয়াদে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক/সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার গৌরবময় অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে আজীবন সম্মাননা পদক প্রদান করেন। তিনি ২০০৬ সালে নাটাব কর্তৃক আজীবন সম্মাননা গ্রহণ করেন।