উপকূলীয় জেলাগুলোয় ব্যাপক প্রস্তুতি আম্ফান মোকাবেলায়

32

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুপার সাইক্লোন আম্ফান মোকাবেলায় উপকূলীয় জেলাগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
‘আম্ফান’ মোকাবেলায় উপকূলীয় জেলা খুলনায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। জেলার ৩৬১টি আশ্রয় কেন্দ্র ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ৬০৮টি কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন।
এদিকে, সাইক্লোন শেল্টারে মানুষকে যাওয়ার আহবান জানিয়ে মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল থেকেই মাইকিং করা হচ্ছে। খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজিজুল হক জোয়ার্দার জানান, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা দাকোপের ১০৮টি, কয়রার ১১৬টি, পাইকগাছার ৪৫টি ও বটিয়াঘাটার ২৩টিসহ ২৯২টি আশ্রয় কেন্দ্রকে আগেই প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতি এড়াতে কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটাসহ বিভিন্ন উপজেলায় রেডক্রিসেন্ট, সিপিপিসহ ৩ হাজার ৫৬০ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। এছাড়া, বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) আরো ১ হাজার ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন।
সুন্দরবন উপকূল সংলগ্ন কয়রা উপজেলা সদরের ইউপি চেয়ারম্যান মো. হুমায়ূন কবির জানান, মাইকিং করে স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে অনুরোধ করার পরে তারা বিকেল থেকে আশ্রয় কেন্দ্রে আসা শুরু করেছেন।
খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এরই মধ্যে ৬০৮টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। সকাল থেকেই মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য মাইকিং চলছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে করোনায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে উপজেলা প্রশাসনকে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জরুরি চিকিৎসার জন্য ১১৬টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটিও বাতিল করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবেলায় বাগেরহাটে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। এরই মধ্যে জেলা দুর্যোগ প্রস্তুতি কমিটি ও ঝুঁকিপূর্ণ ৪ উপকূলীয় উপজেলা কমিটি জরুরি সভা করেছে।
জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ আরো জানান, জেলায় ৮৪৫টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ৫ লাখ ৯৬ হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। দুর্যোগকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ৮৪টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে এবং ১১ হাজার ৭০৮ জন স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
‘আম্ফানের’ আগেই মাঠে থাকা অবশিষ্ট পাকা ধান যে কোনো অবস্থায় দ্রæত কেটে কৃষকের ঘরে তুলতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে। বাগেরহাট রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে এলাকাবাসীকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে বাগেরহাটের শরণখোলা, মংলা, মোড়েলগঞ্জ এবং রামপাল উপজেলার উপকূলবর্তী মানুষের। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে দুর্যোগকালীন সময়ে আশ্রয় কেন্দ্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বাগেরহাটে আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার কাজের জন্য কুইক রেসকিউ টিম গঠন করা হয়েছে।
মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার শেখ ফকর উদ্দিন জানান, সোমবার পর্যন্ত বন্দরে সার, ফ্লাইঅ্যাশ, কয়লাবাহীসহ মোট ১১টি দেশী-বিদেশী জাহাজ অবস্থান করছে। বন্দরে অবস্থান নেয়া জাহাজগুলোতে পণ্য ওঠানামার কাজ বন্ধ রয়েছে। জাহাজগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বন্দরে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বন্দরের সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবেলায় ল²ীপুরে ২০১টি সাইক্লোন শেল্টার বা আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি ত্রাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার মজুদ করা হয়েছে। এছাড়াও, উপকূলীয় চরাঞ্চল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লোকজনের মাঝে সচেতনতা ও সতর্কতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মাইকিংসহ সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ সফিউজ্জামান ভূঁইয়া জানান, জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবেলায় জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় ঘূর্ণিঝড়ের আগে ও পরে কি কি ব্যবস্থা নেয়া যায়, সেসব বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জেলার ৫টি উপজেলার মধ্যে সদর উপজেলার আংশিক এলাকাসহ রামগতি, কমলনগর ও রায়পুর ঝুঁকিপূর্ণ। উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লোকজন ও গবাদি পশুগুলোকে নিকটবর্তী সাইক্লোন শেল্টারে সরিয়ে আনা হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে আগের ১০১টি সাইক্লোন শেল্টারের সঙ্গে আরো ১০০টিসহ মোট ২০১টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সিভিল সার্জন ডা. আবদুল গাফফার জানান, ঘূর্ণিঝড়ের আগে ও পরে মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ৬৬টি মেডিকেল টিম গঠন করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ রাখা হয়েছে। সার্বিক যোগাযোগ ও খোঁজখবর রাখার জন্য ০১৭৩৫-০০৩৫৫৫ ও ০১৮১৯-৫২৪৮০২ নম্বরে ২৪ ঘণ্টা হটলাইন চালু করা হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবেলার প্রস্তুতি সম্পর্কে বরগুনার জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, বরগুনা সদর, বামনা, আমতলী, বেতাগী, পাথরঘাটা ও তালতলী মোট ৬ উপজেলায় প্রস্তুত ৫০৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৮০ হাজার ৪২৪ জন মানুষ, প্রায় ১০ হাজার গবাদি পশু এবং ৩০ হাজার হাঁস-মুরগি নিয়ে আশ্রয় নিতে পারবে। আশ্রয় কেন্দ্র পরিষ্কার করে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়েছে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বরগুনায় ২২টি পোল্ডারে সাড়ে ৯০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, মহাসেন, ফণীসহ একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় সাড়ে ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সদরের নলটোনা, এম বালিয়াতলি, বদরখালী ও বুড়িরচর এবং আমতলী, তালতলী বামনা ও বেতাগী উপজেলার নদী তীরবর্তী ৩৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আতঙ্কে রয়েছেন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ এলাকার লক্ষাধিক বাসিন্দারা।
ফেনী জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজজামান মঙ্গলবার জানান, ইতোমধ্যে ফেনীর সোনাগাজীসহ উপকূলীয় এলাকায় আশ্রয় কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রে লোকজন ও গবাদিপশু সরিয়ে আনতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
সোনাগাজীতে ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে বলে জানান সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী অফিসার অজিত দেব। ইউএনও বলেন, উপজেলার ৫৬টি সাইক্লোন শেল্টারের ব্যবহার উপযোগী ৫২টি আশ্রয়দানের প্রস্তুতি চলছে। উপকূলীয় ৪ ইউনিয়ন চর দরবেশ, চর চান্দিয়া, সদর ও আমিরাবাদে ২৫টি সাইক্লোন শেল্টার ও ৩৩টি স্কুল ঘর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। করোনার কারণে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে সোনাগাজী পৌর এলাকায় শেল্টারেও মানুষজন সরিয়ে আনতে হতে পারে। স্বেচ্ছাসেবী সিপিপির টিম প্রস্তুত রয়েছে। ১১টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। ১০ হাজার মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রবিউল হাসান বলেন, ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ পরিস্থিতি মোকাবেলায় উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা ও করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধকল্পে উপজেলা রেসপন্স কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীতে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, উপকূলীয় উপজেলা হাতিয়া, সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাটের ৩২৩টি আশ্রয় কেন্দ্র, ৬ হাজার ৭০০ স্বেচ্ছাসেবক, ৩ শতাধিক রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কর্মী ও শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় উপকূলীয় এলাকার স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টারগুলোর চাবি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে উপকূলীয় অঞ্চলের বেড়িবাঁধগুলো দেখাশোনা করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
উপকূলীয় এলাকার করোনা আক্রান্ত রোগী এবং লকডাউনকৃত বাড়ির লোকজনকে নিকটবর্তী আইসোলেশন কেন্দ্রে প্রেরণ এবং আশ্রয়ন কেন্দ্রে তাদের জন্য বিশেষ কক্ষে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এলাকার লোকজন ও গবাদিপশুকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে।
ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ মোকাবেলায় সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আলিফ রেজা জানান, আজ (মঙ্গলবার) দুপুর দেড়টার পরে আকাশ মেঘলা হয় ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে থাকে। সকাল থেকে মাইকিং এবং প্রায় ৩ হাজার মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া সম্ভব হয়েছে। বাকিদের সন্ধ্যার মধ্যে সাইক্লোন শেল্টারে নেয়ার চেষ্টা চলছে।
সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকা শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ ন ম আবুজর গিফারি জানান, সকাল থেকে আকাশ পরিষ্কার ও রোদ উঠলেও দুপুরের দিকে মুন্সীগঞ্জ, গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নে কিছুক্ষণ বৃষ্টি হয়। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া গেছে। বর্তমানে নদীতে ভাটা চলছে।
ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ মোকাবেলায় পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান মোকাবেলায় জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে গত রবিবার।
সিপিপি, রেড ক্রিসেন্ট ও ফায়রা সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবেলায় তাদের নিজ নিজ অফিসের স্বেচ্ছাসেবকরা সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি রয়েছে।
সভায় জেলা প্রশাসক জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবেলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। জেলায় ৩৩০টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর সাথে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা, কলেজ এবং জেলার সকল হোটেল-মোটেল আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে।