উচ্চশিক্ষায় যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে

66

gourbangla logo

শিক্ষক আন্দোলনের কারণে বছরের শুরুতেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী প্রায় ৫৬ লাখ শিক্ষার্থী সংকটের মুখে পড়তে চলেছেন। গত শনিবার সহযোগী একটি দৈনিকে প্রকাশিত শিক্ষাসংক্রান্ত এ খবরটি নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের সার্বিক প্রেক্ষাপটে গভীর চিন্তারই বিষয়। শিক্ষা হলো একটি জাতির ভিত্তি। কেননা, একটি সুশিক্ষিত জাতিই দেশের কল্যাণ সাধন করতে পারে। ফলে শিক্ষার্থী জীবনে কোনো ধরনের চাপ তৈরি হলে তার মতো পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে। সত্য যে, বিভিন্ন দাবিতে শিক্ষকরা আন্দোলন-সংগ্রাম চালাতেই পারেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় তা সমাধানযোগ্যও বটে। কিন্তু এসব আন্দোলন-সংগ্রামের নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর পড়লে কিংবা তাদের ওপর কোনো ধরনের চাপ তৈরি হলে তা কিছুতেই মেনে নেয়ার উপায় থাকে না। শিক্ষা যেহেতু রাষ্ট্রের নাগরিকের নৈতিক ভিত্তি মজবুত করে, সুতরাং শিক্ষার পরিবেশ সব ধরনের চাপমুক্ত হওয়া সংগত।
গণমাধ্যমের তথ্যমতে, চলতি সপ্তাহেই দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ৩০৬টি সরকারি কলেজে একযোগে শিক্ষকরা নানা মেয়াদে কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন। বিষয়টি অবশ্যই আতঙ্কের। শিক্ষকরা এমন আন্দোলনে নামলে সারা দেশের বিপুল উচ্চশিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এতে সেশনজট সৃষ্টি হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এমনটি ঘটলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অন্তত ২৬টি পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধিসহ দেশের উচ্চশিক্ষার্থীরা যে নানামুখী সংকটে পড়বেন, তা বলাই বাহুল্য। এমন অচলাবস্থা কিছুতেই স্বস্তির হতে পারে না।
জানা যায়, সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল বাতিল করার প্রতিবাদে এবং অধ্যাপকদের বিদ্যমান বৈষম্যমূলক বেতন স্কেল আপগ্রেডেশনের দাবিতে শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন। শিক্ষকদের এ বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিব্রত হয়েছেন। ফলে চলমান এ সমস্যার সমাধান কোথায়থ তা-ই এখন সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় নিতে হবে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরাজমান সমস্যার সমাধান মূলত অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাতে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে অর্থ বরাদ্দ কম পাওয়ায় মন্ত্রণালয়ের উন্নয়নমূলক সব কার্যক্রম কাটছাঁট করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষকদের দাবির বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। আমরা মনে করি, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বিবেচনায় বিষয়টির একটি যৌক্তিক সমাধান করতে হবে সংশ্লিষ্টদেরই।
লক্ষণীয় যে, ইতোমধ্যে ৪ ও ৫ জানুয়ারি দেশের ৩০৬টি সরকারি কলেজ বন্ধ রেখে শিক্ষকরা সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করেছেন। আবার বিসিএসের ২৬টি ক্যাডারের সমন্বয়ে গঠিত প্রকৃচি ১১ থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন ২ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে ১১ জানুয়ারি থেকে দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ডাক দিয়েছেন। এমনকি এ সময়ে কোনো পরীক্ষা ও সান্ধ্যকালীন কোর্সও তারা পরিচালনা করবেন না। আবার এসব শিক্ষকের সঙ্গে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরাও দাবি জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেলে, টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড তুলে দেয়ায় ৪০ হাজার শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারাও যে কোনো সময় আন্দোলনে নামবেন। ফলে সার্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এমন আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, শুধু উচ্চশিক্ষা নয়, গোটা শিক্ষা খাতই বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে। সংগত কারণে, বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নিতে হবে।
আমরা যেমন মনে করি শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, তেমন যারা মানুষ গড়ার কারিগর তারাও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত হবেন, তা-ও আমাদের প্রত্যাশা নয়। আবার দেশের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই শিক্ষকদের আন্দোলনে যাওয়া সমীচীন। শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে শিক্ষকরা যদি নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের আন্দোলন করেন তাহলে তা শিক্ষকদের হঠকারিতা বলেই প্রতীয়মান হবে। আমরা বলতে চাই, দাবি আদায়ে আন্দোলন করা যেতেই পারে, কিন্তু সতর্ক থাকা প্রয়োজন যে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব যেন শিক্ষার্থীদের ওপর না পড়ে।