ঈদ এ মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

169

9e8cae912d85c7afca84527c8249ad5c-copyঈদ অর্থ হচ্ছে খুশি বা আনন্দ প্রকাশ করা, মিলাদ অর্থ হচ্ছে জন্মের সময় বা দিন। আর আন নাবিইয়্যু শব্দ দ্বারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝানো হয়। আভিধানিক অর্থে ঈদে মিলাদুন্নবী বলতে মহানবী (সা.) এর বিলাদত শরীফ তথা জন্ম দিন উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করাকে বুঝায়। আর পারিভাষিক অর্থে ঈদে মিলাদুন্নবী বলতে মহানবী (সা.) বিলাদত শরীফ তথা জন্ম দিন উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা ছানা-ছিফত, ফাদ্বায়িল-ফযিলত, শান-মান বর্ণনা করা, সালাত সালাম পাঠ করা উনার পূত-পবিত্র জীবনী মোবারক এর সামগ্রীক বিষয়ের আলোচনাকে বুঝায়। মিলাদ শব্দটিও আরবি কিন্তু আমাদের দেশে এর প্রচলন ফার্সি ভাষা থেকে হয়েছে। অনেকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট না জেনে এ শব্দটিকে আরবি ভাষার আঙ্গিকে তুলে ধরে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করেন। ফার্সিতে মিলাদ অর্থ ঝামানে তাওলীদ বা জন্মের সময় (সূত্র: ফারহাঈ জবানে ফার্সি)। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র ক্বোরআন শরীফে মহানবী (সা.) এর মিলাদ ও তার মান-মান বর্ণনা করে বলেন- হে আমার হাবীব (সা.), আপনি স্মরণ করুন সেই দিনের এ কথা আল্লাহ পাক সমস্ত নবী ও রাসূলগণ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন এ কথার উপর যে, যখন আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করবো তারপর তোমাদের কাছে আমার মহান রাসুল যাবেন এবং তোমাদের নবুওয়াত ও কিতাবের সত্যতার সাক্ষ্য প্রদান করবেন, তখন তোমরা অবশ্যই উনাকে উপর ঈমান আনবে এবং অবশ্যই উনাকে সাহায্য করবে। আল্লাহপাক বলেন, তোমরা কি এসব কথার উপর অঙ্গীকার করছো এবং এই শর্তে আমার ওয়াদা গ্রহণ করে নিয়েছো? তখন তাঁরা সকলেই সমন্বয়ে বলেছিলেন আমরা অঙ্গীকার করছি। আল্লাহ বলেন তাহলে তোমরা পরস্পর সাক্ষী থাকো আর আমিও তোমাদের সাথে মহা সাক্ষী রইলাম। অতঃপর যে কোন লোক এই অঙ্গীকার থেকে ফিরে যাবে সেই হবে ফাছিক, (সূরা: আল-এমরান, আয়াত নং- ৮১,৮২)। উক্ত দুটি আয়াতের মধ্যে মহানবী (সা.) এর ব্যাপারে ১০টি বিষয় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যথা মহানবী (সা.) এর মিলাদ এর আলোচনা, মহনবী (সা.) এর শান-মান বাস্তবায়নের অঙ্গীকার, মহানবীর আগমন হলে উনার উপর ইমান আনা, মহানবীর আগমনের ভিত্তিতে নবীগণের সত্যতার প্রমাণ, মহানবী (সা.) কে নিঃশর্তভাবে সাহায্য করা, নবীগণের স্বীকৃতি প্রদান, পরস্পরের সাক্ষী হওয়া, আল্লাহপাক সাক্ষী হওয়া, ওয়াদা ভঙ্গের পরিণাম। বিদ্যমান আয়াত দু’টিতে মহানবী (সা.) এর রেসালাতের ব্যাপারে আল্লাহপাক উপরোল্লেখিত ১০টি বিষয় গুরুত্বারোপ করেছেন। কিন্তু তাওহীদের ব্যাপারে মাত্র একবার অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল সেখানে কোন নির্দেশনামূলক অঙ্গীকার ছিল না এবং স্বাক্ষীও রাখা হয়নি। যেমন আল্লাহ বলেন, আলাছতু বিরাব্বিকুম অর্থ- আমি কি তোমাদের রব নই? সমস্ত নবী আদম তখন উত্তরে বলেছিরেন ক্বালু বালা অর্থ- তারা সবাই বলল হ্যাঁ। তাওহীদের ক্ষেত্রে একবার অঙ্গীকার নেওয়া আর রিসালতের ক্ষেত্রে বার বার অঙ্গীকার নেওয়ায় একথা প্রমাণ করে যে, তাওহীদের ক্ষেত্রে তেমন সমস্যা সৃষ্টি হবে না। কিন্তু রিসালতের ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা দেখা দিবে। কেউ মানবে কেউ মানবে না। মহানবী (সা.) তো মানবীয় সুরতে পৃথিবীতে আগমন করবেন ও উনার খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, উঠা-বসা, লেনদেন মানুষের মতই হবে। এগুলো উনার নবুওয়াত ও রিসালত এবং উনার বিশেষ মর্যাদা শান-মান এর কথা মানুষ খুবই কম অনুদাবন করতে পারে। উনার সাথে আমার দেওয়া মর্যাদা না জেনে সাধারণ মানুষের মত বলবে। উনার মর্যাদা খাটো করার চেষ্টা করবে। এ কারণেই মহানবী (সা.) এর নবুওয়াত ও রিসালাত সম্পর্কে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উনার সমর্থন উল্লেখ করে মহান আল্লাহ পাক পৃথিবীর মানুষদের মহানবী (সা.) শান মান আগমনের গুরুত্ব উপলব্ধি করার তাকিদ করেছেন। মিলাদুন্নবীর মূল আলোচ্য বিষয়ই উক্ত আয়াতে আল্লাহ পাক নিজেই বর্ণনা করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ পাক উনার রুবুবিয়্যাত অস্বীকারকারীদের সম্পর্কে তিনি কোন ফতোয়া দেননি। কিন্তু মহানবী (সা.) এর রিসালত ও শান মান অস্বীকারকারীদের ফাসেক তথা কাফের বলেছেন, ক্বোরআন শরীফের অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন- হে মানব জাতি অবশ্যই তোমাদের মধ্যে আল্লাহ পাক উনার পক্ষ থেকে এসেছেন মহান নছীহত স্বরূপ। তোমাদের অন্তরের সকল ব্যাধি সমূহ দূরকারী মহান হেদায়ত ও ঈমানদারের জন্য মহান রহমত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন, ওয়ামা আরছালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামিন, অর্থ হে হাবীব আমি আপনাকে সমস্ত পৃথিবীর মানুষের প্রতি রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি। এ আয়াতে আল্লাহ পাক মহানবী (সা.) কে রহমত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর রহমত প্রাপ্তিতে ঈদ বা খুশি প্রকাশ করা আল্লাহ পাকের নির্দেশ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন, কুল বি ফাদলিল্লাহী ওয়া বি রাহমাতিহী ফাবিঝালিকা ফাল ইয়াফরাহু হুয়া খাইরুম মিম্মা ইয়াজমাউন। অর্থ: হে হাবীব (সা:) আপনি বলে দিন আমার অনুগ্রহ ও রহমত লাভ করার কারণে তারা যেন ঈদ বা খুশি প্রকাশ করে। এই খুশি প্রকাশ করাটা সবকিছুর চেয়ে উত্তম যা তারা দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য সঞ্চয় করে। (সূরা ইউনুস আয়াত নং-১৮)
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, হে হাবীব (সা:) নিশ্চয়ই আমি আপনাকে স্বাক্ষী সু-সংবাদদাতা এবং সতর্ককারী স্বরূপ পাঠিয়েছি। যেন আল্লাহ তা’লার উপর এবং উনার রাসূল (সা.) এর উপর ঈমান আনো এবং উনার খেদমত করো ও উনার তা’যীম-তাকরীম করো এবং উনার ছানা ছিফত বর্ণনা করো সকাল-সন্ধ্যা। (সূরা ফাতহ আয়াত নং ৮-৯)। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ পাক ও তার ফেরেশতাকুল সকল মহানবী (সা.) এর প্রতি দুরূদ শরীফ পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ তোমরাও মহানবী (সা.) এর প্রতি সালাত তথা ছানা ছিফত, তাছবীহ-তাহলীল পাঠ কর এবং সালাম প্রেরণ করো প্রেরণ করার মত। যথাযথ সম্মানের সাথে। অপর এক আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, হে হাবীব (সা.) আপনি স্মরণ করে দেখুন ঐ সময়ের কথা যখন মরিয়ম তনয় ঈসা (আ.) বলেছিলেন হে বনী ঈসরাইল আমি তোমাদের কাছে নবী হয়ে প্রেরিত হয়েছি। আমি আমার পূর্ববর্তী তওরাত কিতাবের সত্যতার স্বাক্ষ্য দিচ্ছি এমন এক মহান রাসূলের সু-সংবাদ দিচ্ছি যিনি আমার পরেই আগমন (মিলাদ হবে) করবেন এবং তার নাম হবে আহমদ। (সূরা আঁছ ছফ আয়াত নং-৬)
উক্ত আয়াতে কারীমা দ্বারা মিলাদ তথা মহানবীর জন্মের আলোচনা, উনার মিলাদ উপলক্ষে ঈদ বা খুশি প্রকাশ করা ছানা ছিফত, ফাদ্বায়েল, ফজিলত শান-মান বর্ণনা করা তার প্রতি সালাত, সালাম পাঠ করা। অশেষ রহমত বরকত লাভের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া কোরআন শরীফে নবী রাসূলগণের আগমন ও বিদায় সম্পর্কে বলা হয়েছে উনার প্রতি সালাম, (রহমত, বরকত ও সাকিনা) যেদিন তিনি আগমন করেন এবং যেদিন তিনি বিদায় নিবেন এবং যেদিন তিনি পনরুত্থিত হবেন। (সুরা মরিয়ম, আয়াত নং- ১৫)। সালাম আমার প্রতি যেদিন আমি আগমন করেছি যেদিন বিদায় নিব ও যেদিন পুনরুত্থিত হবো- (সুরা মরিয়াম, আয়াত ৩৩)। বর্ণিত আয়াত কালিমাদ্বয়ে হযরত ইয়াহইয়া (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.) এর আগমন, বিদায় ও পুরুত্থান প্রত্যেকটাই সালাম, রহমত ও বরকত সাকিনার কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে যিনি সৃষ্টি কূলের মূল মহানবী (সা.) উনার আগমন, বিদায় পুনরুত্থান যে, কতটুকু সালাত, সালাম, রহমত, বরকত ও সাকিনা কারণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মহানবী (সা.) নিজেই নিজের মিলাদ পালনার্থে খুশি প্রকাশ করে বলেন, আমি হলাম হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর দোয়া হযরত ঈসা (আ.) এর সু-সংবাদ এবং আমিনা (আ.) এর দেখা সু-স্বপ্ন ও অলৌকিক ঘটনার বাস্তব প্রতিফলন। আমিনা (আ.) আমার মিলাদ তথা জন্মের সময় দেখেছিলেন যে, একখ- নূর জমিনে তাশরিফ নিলেন এবং সে নূর এর আলোর প্রভাবে সাম দেশের দালান কোটাগুলোকে আলোকিত করল তা তিনি সুষ্পষ্টভাবে দেখতে পেলেন। (তথ্য সূত্র: মুসনাদে আহমদ মিশকাত শরীফ)
অপর এক হাদীসে মহানবী (সা.) স্বয়ং নিজেও নিজের মিলাদ শরীফ সম্পর্কে খুশি প্রকাশ করে স্বীয় বংশ মর্যাদা বর্ণনা করেন- মহান আল্লাহ পাক আমাকে কুল মাখলুকাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম, মাখলুকাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম, গোত্র কুরাঈশ খান্দানে এবং কুরাঈশ গোত্রের বিভিন্ন শাখার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হাশেমী শাখায় এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ঘরে আমাকে প্রেরণ করেছেন। (তিরমিযি মিশকাত শরীফ)
মহানবী (সা.) আরও বলেছেন তোমরা সোমবার দিন রোযা রাখ কারণ ঐদিন আমার জন্ম হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, একদা তিনি নবী (সা.) এর সাথে হযরত আমীর আনছারী (রা.) গৃহে উপস্থিত দেখতে পেলেন যে, তিনি নবীজী বিলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে তার সন্তানাদি এবং আত্মীয়-স্বজন, জাতি গোষ্ঠী, পাড়া প্রতিবেশীদেরকে নিয়ে মহানবী (সা.) এর বেলাদত শরীফের ঘটনা সমূহ শুনাচ্ছেন এবং বলছেন, এই দিবস এই দিবস অর্থ্যাৎ এই দিবসে রাসূল (সা.) তাশরীফ এনেছেন এবং ইত্যাদি ইত্যাদি ঘটেছে। বেলাদত শরীফের ঘটনাবলী শ্রবণ করে মহানবী (সা.) অত্যন্ত খুশি হয়ে বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ পাক রহমতের দরজা আপনার জন্য উন্মুক্ত করেছেন এবং সমস্ত ফেরেশতাগণ আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং যে কেউ আপনার মত এরূপ কাজ করবে, সেও আপনার মত নাযাত লাভ করবে। (তথ্য সূত্র: আততানবীর ফি মাওলিদিল বাশির ওয়ান নাঝির, সুগুলুলহুদা ফি মাওলিদিল মোস্তফা (সা.) হযরত ইমাম জালাল উদ্দিন সুয়ুতী, হাক্বীকতে মুহাম্মদী মীলাদে আহমদী)
ছহীহ বোখারী শরীফের দ্বিতীয় খ-ের ৭৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে যে- হযরত উরওয়া (রা.) বর্ণনা করেন হযরত সুয়াইবা তিনি ছিলেন আবু লাহাবের বাদি। আবু লাহাব মহানবী (সা.) এর বিলাদত শরীফ এ খুশি হয়ে তার খেদমত করার জন্য ঐ বাদিনীকে আজাদ করে দিয়েছিলেন। অতঃপর কিছুদিন পর আবু লাহাব যখন মারা গেলেন তার ভাই হযরত আব্বাস (রা.) তিনি স্বপ্ন দেখলেন যে, আবু লাহাব সে ভীষণ কষ্টের মধ্যে আছে। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন তোমার সাথে আল্লাহ কিরূপ ব্যবহার করছেন, আবু লাহাব উত্তরে বলল, যখন থেকে আপনাদের কাছ থেকে দূরে রয়েছি তখন থেকেই ভীষণ কষ্টে আছি। তবে মহানবী (সা:) এর বেলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে বাদি সুআইবাকে দু’আঙ্গুলের ইশারায় আজাদ করার কারণে সে দুই আঙ্গুল হতে সুমিষ্ট ঠান্ডা ও সু-শীতল পানি পান করতে পারছি। (উমদাতুল ক্বারী)
অনুরূপভাবে আল্লামা হযরত ইবনে কাছীর (র.) এর বিখ্যাত গ্রন্থ বেদায়া নেহায়ায় এ ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে আমাদের বুঝতে হবে যে, আবু লাহাব একজন কাট্টা কাফির হওয়া স্বত্বেও শুধুমাত্র মহানবী (সা.) এর আগমনে খুশি হওয়ার কারণে পরকালে সে নিয়ামত পাচ্ছে। আমরা তো মুসলমান। ঈমানদার মুসলমান হিসেবে নবীর আগমন দিবসে খুশি প্রকাশ করলে কি পরিমাণ নিয়ামত লাভ করা সম্ভব তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। উপরোক্ত কোরআন শরীফ হাদীস শরিফের বর্ণনামতে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালন করা উদযাপনে যথাযথ খুশি প্রকাশ করা মুমিন মুসলমানদের অবশ্য অবশ্যই কর্তব্য। পরকালে নাযাত পাওয়ার উছিলা। মহান আল্লাহ পাক মহানবী (সা.) এর সান, মান ও মর্যাদা যথার্থ অনুদাবন করার সকলের প্রতি তওফিক দান করুন। আমিন।