ইসলামের দৃষ্টিতে মানবাধিকার

145

9e8cae912d85c7afca84527c8249ad5c-copyবিশ্বপ্রভু মহান আল্লাহ তা‘য়ালা এ পৃথিবীতে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য। তাঁর ঘোষণা : “আমি মানুষকে একমাত্র আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন কারণে সৃষ্টি করি নাই”। এ পৃথিবীতে মানুষের চলাফেরা কাজকর্ম এককথায় জীবন ধারণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা মানুষকে সে নীতিমালা দান করেছেন। যার নাম দ্বীন বা ধর্ম। আল্লাহ তা‘য়ালার কাছে মনোনিত একমাত্র দ্বীন বা ধর্ম ইসলাম। ইসলাম শব্দটি আরবী শব্দ ‘সিলম’ হতে উৎপত্তি। শাব্দিক অর্থ : আত্মসমর্পণ করা, আনুগত্য প্রকাশ করা, বশ্যতা স্বীকার করা, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করা প্রভৃতি। সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণ করে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভের নাম ইসলাম। ইসলাম আল্লাহ মনোনিত শ্বাশত পূর্ণাঙ্গ জীবন আদর্শ তথা পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। আল্লাহর বাণী : “নিশ্চয় আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনিত জীবন ব্যবস্থা হল ইসলাম” (সুরা আলে ইমরান : ১৯)।
মানবাধিকার শব্দটি মানব ও অধিকার শব্দ দু‘টির যৌগিক রূপ। মানব তথা মানুষ এ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ট জীব। রক্ত মাংসে গড়া মানুষের আছে প্রবৃত্তি। জীব হিসেবে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে আছে মনুষ্যত্ব ও পশুত্ব। অধিকার শব্দের অর্থ স্বত্ত্ব, স্বামীত্ত্ব প্রভৃতি। যে কারো জন্য যেটি একান্ত প্রয়োজন, যা না হলে তার স্বাভাবিকতা বাধাগ্রস্ত হয় বেঁচে থাকা, টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য বিষয়ই অধিকার। জন্মলাভের পর বেড়ে উঠা, বেঁচে থাকার জন্য মানুষ পেয়ে থাকে সহজাত প্রবৃৃত্তি। এ প্রবৃত্তিগুলো স্বাভাবিক, সাবলীল, চিরন্তন, আবশ্যকীয় ও অপরিহার্য। এ বৃত্তিগুলো সংরক্ষণ ও বিকাশ সাধন মানুষের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য। যে কোন মানুষের এগুলি প্রাপ্তি তার অধিকার সংরক্ষণ আবার অপ্রাপ্তি অধিকার বঞ্চিত করা।
দেশ, জাতি, সমাজ, ধর্ম ও পারিপার্শ্বিকতার উপর নির্ভর করে জাতিসংঘ গবেষণার ভিত্তিতে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। ১৯৪৮ খ্রি. ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পৃথিবীর সকল দেশের সকল নাগরিকের জন্য সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা করা হয়। মানুষের সামগ্রিক অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার নিমিত্তে সমাজ-রাষ্ট্রের সর্বস্তরে এ ঘোষণাপত্রটি প্রতিষ্ঠার দাবি রাখে।
ইসলাম মানুষের কল্যাণের নিমিত্তে তার অধিকার সংরক্ষণের সর্বাত্মক গুরুত্ব আরোপ করেছে। জাতি সংঘ মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র প্রকাশ করার অনেক অনেক পূর্বে অর্থাৎ বর্তমান থেকে প্রায় দেড় হাজার বছরের পূর্বে ইসলাম মানুষের সার্বজনীন অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে বর্বর জাহিলিয়াতের যুগে শান্তির স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। আমরা এ পর্যায়ে ইসলামের আলোকে মানবাধিকার বিষয়ে আলোচনা করব।
০১. মানুষ সামগ্রিকভাবে সমতার অধিকারী। মানুষের মাঝে থাকবেনা কোন ভেদাভেদ শ্রেণী বৈষম্য। ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো, লম্বা-বেঁটে, উচু-নিচু, প্রভু-ভৃত্য, আমীর-ফকীর, অনারব-আরবের মাঝে কোন ভেদাভেদ থাকবেনা এ মহত শিক্ষা দেয় ইসলাম। ইসলামী বিধান মতে সমগ্র পৃথিবীর সমস্ত মানুষ এক জাতি। মহান আল¬াহ তা‘য়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-“হে মানব সকল আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে সৃষ্টি করেছি। তোমাদের পরিচিত হওয়ার জন্য তোমাদেরকে বিভিন্ন গোত্র ও বংশে বিভক্ত করেছি। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে আল্লাহকে অধিক ভয় করে। নিশ্চয় মহান আল্লাহ তা‘য়ালা সবকিছুর খবর রাখেন” (সুরা হুজরাত : ১৩)। মহানবী স. মানুষের মধ্যে সমতার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য দুরীভূত করার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করেন। এমনকি বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি এ বিষয়ে বলতে ভুলে যাননি। তিনি বলেন- “কোন অনারবের উপর কোন আরবের কোন মর্যাদা নাই, আবার আরবের উপরও অনারবের মর্যাদা নাই একমাত্র মর্যাদার মাপকাঠি খোদাভীরুতা”।
০২. ইসলাম মানুষের জীবন স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। প্যাট্রিক হেনরী বলেছেন-“এরাব সব ষরনবৎঃু ড়ৎ মরাব সব ফবধঃয”  আমাকে স্বাধীনতা দাও নইলে মৃত্যু দাও। জীবন স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা মানুষের সহজাত অধিকার। জীবন স্বাধীনতার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে ইসলাম সমাজ থেকে দাসত্ব প্রথা উচ্ছেদ করে। মহানবী স. দাসত্ব প্রথার বিলোপ সাধনে দাসদের মুক্ত করণের জন্য বিত্তবানদের প্রতি আহবান জানান। একমাত্র ইসলামের সুমহান আদর্শের বলেই সমাজ থেকে দাসত্ব প্রথা দুরীভূত হয়। মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে ইসলাম সুনির্দিষ্ট বিধান জারি করে। মহানবী স. ঘোষণা করেন- “কিয়ামতের দিনে বান্দাহর সর্বপ্রথম বিচার ফায়সালা হবে রক্তপাত সম্বন্ধে। ইসলাম মানুষের ইজ্জত সম্মান ও শারিরিক নিরাপত্তার বিধান করে। ইসলাম শুধুমাত্র মুসলমান নয় বরং অমুসলিদের নিরাপত্তা প্রদান করে। নবীজি স. বলেন-“তোমরা মজলুমের (অত্যাচারিত) আর্তনাদকে ভয় কর, যদিও সে অবিশ্বাসী কাফিরও হয়”। অর্থাৎ অমুসলিমদের উপরও কারো অত্যাচার করার অধিকার নাই।
০৩. সঠিক বিচার লাভ করা ও আইনের দৃষ্টিতে সমান মর্যাদার দাবিদার প্রত্যেক মানুষ। ইসলাম সঠিক বিচারের মানদন্ড প্রতিষ্ঠিত করে। মহান আল্ল¬াহ তা‘য়ালা বলেন- “নিশ্চয়ই আল্ল¬াহ ন্যায় বিচার ও ইহসান প্রতিষ্ঠার নির্দেশ প্রদান করছেন” (সুরা নহল : ৯০)। বর্ণিত আছে একদা এক অমুসলিমের সাথে এক মুসলিমের দ্বন্দ্বের বিচার রাসুল স. এর কাছে চাওয়া হলে, তিনি ইনসাফ ভিত্তিক অমুসলিমের পক্ষেই রায় প্রদান করেন। এটি নজীরবিহীন কারণ তিনি সঠিক বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজ লোকের বিরুদ্ধে রায় দিতে কুন্ঠাবোধ করেননি। আল্লাহর বাণী- “তুমি তাদের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনায় সুবিচার করবে। নিশ্চয়ই আল¬াহ তা‘য়ালা সুবিচারকারীদের ভালবাসেন” (সুরা মায়েদা : ৪২)।
০৪. ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারী হওয়া অন্যতম উল্লেখযোগ্য মানবাধিকার। ইসলামের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে যে কেউ ব্যক্তিগতভাবে সম্পদের মালিক হতে পারবে, তবে শর্ত হলো সে সম্পদ হালাল উপায়ে উপার্জিত হতে হবে। ইসলামী শরিয়ত প্রত্যেক সম্পদশালীর উপর কতিপয় বিধি বিধান আরোপ করে, যা অন্যান্য ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে। দরিদ্র গোষ্ঠীর জন্য যাকাত ও ব্যক্তিগত দান-খায়রাত, পিতা-মাতা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যাসহ নিকট ও দুরাত্মীয়দের লালন পালন ও সেবা শশ্রুষা করা প্রত্যেক সম্পদশালীর জন্য আবশ্যকীয়। ব্যক্তিগত ভাবে অর্জিত সম্পদে ইসলামী রাষ্ট্রের কোন হস্তক্ষেপ থাকেনা বরং ব্যক্তিগত পর্যায়ে অর্জিত সম্পদকে সুরক্ষার জন্য ইসলাম প্রবিধান জারি করে। আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-“হে ঈমানদারগণ, তোমরা একে অপরের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কিন্তু তোমাদের পরস্পরের সম্মতিতে ব্যবসা করা হালাল। তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না, আল¬াহ তোমাদের প্রতি দয়ালু” (সুরা নিসা : ২৯)। অপরের অবৈধ হস্তক্ষেপকে ইসলাম অনুমোদন করেনা বরং সম্পদ ও ইজ্জতের সংরক্ষণের প্রবিধান জারি করে। মহানবী স. বলেন- “প্রকৃত মুসলমান সে ব্যক্তি যার হাত ও রসনার অনিষ্ঠ হতে অপর মুসলমানেরা নিরাপদ থাকে”।
০৫. ইসলাম প্রত্যেকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করে। মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন ও মনুষ্যত্বের  উৎকর্ষ সাধনে শিক্ষার বিকল্প নেই। তাই শিক্ষার প্রতি ইসলাম সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে। মহানবীর স. উপর অবতীর্ণ প্রথম বাণী- “পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন” (সুরা আলাক : ০১)। শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে মহানবী স. ঘোষণা করেন- “প্রত্যেক মুসলমানের উপর বিদ্যার্জন ফরজ” (বায়হাকী)।
০৬. মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীনচেতা তাই নিজস্ব বিশ্বাস ও ধর্মের স্বাধীনতা পাওয়ার অধিকারী। ইসলাম মানুষের নিজস্ব বিশ্বাস ও ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেছে। মানুষের ব্যক্তিগত নিজস্ব বিশ্বাসকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। আল-াহর বাণী- “অতএব আপনি উপদেশ দিন, আপনিতো একজন উপদেশদাতা ছাড়া কর্মনিয়ন্ত্রক নন” (সুরা গাশিয়া : ২১-২২)। এছাড়া ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যাপারে মহান আল্ল¬াহ তা‘য়ালা বলেন- “দীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই, সত্যপথ ভ্রান্ত পথ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে” (সুরা বাকারা : ২৫৬)
এছাড়াও ইসলাম পিতামাতার অধিকার, নারীর অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, শিশুর অধিকার তথা সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে সুখী সমৃদ্ধশালী সামাজিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে।
লেখক : মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও প্রভাষক, রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজ।

mdatiqurrohman@gmail.com