ইলা মিত্রের স্মৃতিবিজড়িত রাওতাড়া গ্রামে ৫০০ হাঁড়ি বেঁধেছে যুবরা

26

প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখি সংরক্ষণ করা জরুরি। প্রকৃতিতে অনেক পাখিই এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেক পাখি হারিয়ে গেছে। আজকাল খুব চেনা পাখিগুলোও চোখে পড়ে না। এখন গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে হেঁটে গেলে কদাচিৎ চোখে পড়ে বাবুই পাখির বাসা।
পাখির কিচির-মিচির শব্দ আর কানে ভাসে না। ঘুঘুর ডাকও শোনা যায় না। অথচ পাখির বিকল্প নেই। পাখির অনুপস্থিতির অর্থই প্রকৃতি মৃতপ্রায়। বাংলাদেশের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ হওয়ার কারণে একসময় দেশে প্রচুর পাখি ছিল। এখন নেই। ২০১৪-১৫ সালের বন ও পরিবেশ বিভাগের তালিকার তথ্যানুযায়ী গত ১৫ বছরে অন্য প্রাণীর তুলনায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বিলুপ্তির হার সবচেয়ে বেশি। ১৯ প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পাখির মধ্যে রয়েছে- দাগিডানা, সারল, ধূসর মেটে তিতির, বালিহাঁস, গোলাপি হাঁস, বড় হাড়গিলা, ধলাপেট বক, সাদাফোঁটা গগন রেড, রাজ শকুন, দাগি বুক টিয়াঠুঁটি, লাল মাথা টিয়াঠুঁটি, গাছ আচড়া, সবুজ ময়ূর ইত্যাদি। এখন কম দেখতে পাওয়া যায়, এরকম পাখিগুলো হলো- দোয়েল, টিয়া, ময়না, বুলবুলি, চড়াই, শ্যামা, শালিক, টুনটুনি, ঘুঘু, কাঠঠোকরা, মাছরাঙ্গা, কোকিল, চন্দনা, সাদা বক, কালিম, ডানা ঘুরানি, বউ কথা কও, বাবুই ইত্যাদি।
এ অবস্থায় প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নাচোল উপজেলা প্রশাসনের আহ্বান সাড়া দিয়ে পাখি সংরক্ষণে উদ্যোগী হয়েছে উন্নয়ন সংস্থা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি। উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের রাওতাড়া গ্রামে কার্যক্রম শুরু করেছে। বলাবাহুল্য, রাওতাড়া গ্রামটি বিপ্লবী ইলা মিত্রের তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান।
রাওতাড়া গ্রামের খাঁড়িঘেঁষা বনজঙ্গলের গাছগুলোতে এরই মধ্যে প্রয়াসের সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় ৫০০ হাঁড়ি বাঁধা হয়েছে। আর এ হাঁড়িগুলো বেঁধেছে নেজামপুর ইউনিয়নের সকল ওয়ার্ডের যুবরা। পর্যায়ক্রমে আরো অন্য এলাকায় পাখির অভায়রণ্য গড়ে তুলতে হাঁড়ি বাঁধা হবে বলে জানিয়েছেন প্রয়াস সমৃদ্ধি কর্মসূচির সমন্বয়কারী উজ্জল হোসেন। তিনি বলেন, সম্মানিত নাচোল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাইমেনা শারমীনের আহ্বানে এবং প্রয়াসের সম্মানিত নির্বাহী পরিচালক হাসিব হোসেনের নির্দেশনায় পাখির অভায়রণ্য গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেয়া হয়। আর এ উদ্যোগে সহযোগিতা দিয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।
উজ্জল হোসেন বলেন, পাখির অভায়রণ্য গড়ে তুলতে উপজেলা প্রশাসন রাওতাড়া গ্রামকে নির্ধারণ করে দেয়। প্রথম পর্যায়ে ওই গ্রামের গাছগুলোতে ৫০০ হাঁড়ি বাঁধা হয়েছে। হাঁড়িগুলো বাঁধার জন্য নেজামপুর ইউনিয়নের সকল ওয়ার্ডের শতাধিক যুবকে ২ দিনব্যাপী চারটি ব্যাচে ভিডিও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। হাঁড়ি বাঁধার উদ্বোধন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের দিন অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর।
হাঁড়ি বাঁধা কর্মকাণ্ডে  অংশ নেয়া যুব সদস্য নেজামপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের চন্ডিপুর গ্রামের রাকিব হোসেন বলেন- প্রয়াস সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় নেজামপুর অফিসে চতুর্থ ব্যাচে আমি ‘স্বপ্ন আমার উদ্যোক্তা হবো’ শীর্ষক ২ দিনের ভিডিও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। সেই প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে যেমন প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখছি, তেমনি সমাজ এবং পরিবেশকেও বাসযোগ্য করে তুলতে শিখেছি। তারই ধারাবাহিকতায় রাওতাড়া গ্রামে আমরা যুবরা সমন্বিত উদ্যোগে পাখিপল্লী বা পাখির অভয়ারণ্য তৈরি করছি। তিনি বলেন, নিজেকে খুব ভালো লাগছে এমন সুন্দর কাজের অংশীদার হতে পেরে। এজন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই প্রয়াস ও পিকেএসএফকে, যাদের সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুবরা এই মহৎ কাজে অংশ নিতে পারছে।
আরেক যুব সদস্য নেজামপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের হলদিবাড়ী গ্রামের মোসা. আরিফা। তিনিও প্রয়াস সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় ২ দিনের ভিডিও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে জানান। আরিফা বলেন, ওই প্রশিক্ষণ নেয়ার পর থেকে আমি নিজেকে আরো উদ্যোগী মনে করছি। বেকার না থেকে নিজে থেকে যে অনেক কিছু করার আছে তা এই প্রয়াস সমৃদ্ধি কর্মসূচি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে। আশা করছি, নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সমাজকে সুন্দর পরিবেশ দিতে কাজ করে যাব। তিনি বলেন, আমরা প্রায় ১০০ যুব এই পাখিপল্লী তৈরি করে তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছি। আমাদের এই সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার জন্য পিকেএসএফ, আমাদের ইউএনও স্যার ও প্রয়াসের নির্বাহী পরিচালক স্যারের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।
এ বিষয়ে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হাসিব হোসেন বলেন, “পাখি বিলুপ্তি ও বিতাড়ন রোধের মাধ্যমে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ বাঁচাতেই হবে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতেই হবে। না হলে মানুষ তার মনোবিকাশ বা বৈচিত্র্যময় চিন্তার উৎকর্ষতা হারিয়ে ফেলবে। আমি মনে করি, দেশে বন্যপ্রাণী ও পাখি সংরক্ষণের জন্য অনেক আইন ও বিধিবিধান থাকলেও সেগুলো পর্যাপ্ত লোকবল সংকট, সচেতনতা, তদারকি ও জবাবদিহির অভাব; রাজনৈতিক প্রভাবসহ নানা কারণে কার্যকর হচ্ছে না। ফলে দিন দিন দেশে বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার ও নিধনের ঘটনা বেড়েই চলেছে, যা পরিবেশের জন্য এক অশনিসংকেতই বটে।” তিনি বলেন, “পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ জরুরি ভিত্তিতে এসব বন্যপ্রাণী ও পাখি সংরক্ষণের জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। প্রয়োজন বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন বিভাগকে জরুরি ভিত্তিতে শক্তিশালী করা। সর্বোপরি সরকার, বন বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সবারই এ ক্ষেত্রে দ্রুত একযোগে এগিয়ে আসা প্রয়োজন; যেন বাংলার এই সবুজ প্রাকৃতিক ভূমি বন্যপ্রাণী ও পাখিদের জন্য নিরাপদ অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তাই স্থানীয় জনসাধারণকে বিশেষ করে যুবাদের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী ও পাখি সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনভাবে গড়ে তোলা জরুরি। কেননা তারা সমাজকে এগিয়ে নিতে পারবে অনেক দূর, আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণে পেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করতে পারবে। তাই আমরা একটা ছোট জায়গায় কাজ শুরু করেছি। যা দেখে অন্যরাও এগিয়ে আসবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
নাচোল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাইমেনা শারমীন জানান, সম্মানিত জেলা প্রশাসক স্যারের নির্দেশনা ছিল পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলার। স্যারের নির্দেশনা মোতাবেক আমরা নাচোল উপজেলায় পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে ৫টি জায়গা নির্ধারণ করেছি। এর মধ্যে গোপালপুরে কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। আর নেজামপুরের রাওতাড়া গ্রামে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। বাকি তিনটিতে আশা করছি এ বছরের মধ্যেই সম্পন্ন হবে।
ইউএনও বলেন, পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলার জন্য লোকালয় ছেড়ে একটু দূরের বনজঙ্গলকে বেছে নেয়া হয়েছে। যাতে ছোট ছোট শিশুরা হাঁড়িগুলো ভেঙে ফেলতে বা নষ্ট করতে না পারে। তাছাড়া হাঁড়িগুলো সংরক্ষণ বা দেখভাল করার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের বলা হয়েছে।