আড়ালে চলে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খাবার

6

মমতাজ বেগম

ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাদ্য খেতে হয়। জীবন ধারণে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য প্রয়োজন। তবে সব স্থানে মানুষের খাবার একইরকম নয়। নানা কারণে খাবারের উপকরণ ভিন্নরকম হয়। পৃথিবীতে বাহারি খাবারের স্বাদ-গন্ধ আছে। তার মাঝে একেক স্থানে একেক খাবার বেশ সমাদৃত হয়ে থাকে। সে সূত্রে আমাদের, বিশেষ করে এই চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো খাবার খুব সাধারণ, আবার কোনোটা বিশেষ। কোনো খাবার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে আছে। তবে পরিতাপের বিষয়, আমাদের স্থানীয় খাবারগুলো দিনে দিনে হারিয়ে যেতে চলেছে; যেন বিলুপ্তপ্রায়। যা একসময় ছিল মুখরোচক ও আবশ্যকীয়।
রুচি-পছন্দ, সহজলভ্য উপকরণ, প্রভৃতি কারণে আমরা দেখি অনেক মজাদার ঐতিহ্যবাহী খাবার। কোনোটা চলমান, আবার কোনোটা হারিয়ে যাচ্ছে। কোনোটা আবার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। যেন ডুবসাঁতারে খেলার মতো। হঠাৎ কোনো একসময় দেখা মিলে যায় হয়তো। আবার কোনোটা বাণিজ্যিকভাবে তৈরি ও সরবরাহ হতে দেখা যায়। যে খাবারগুলো খুব স্বাদের আর কাক্সিক্ষত ছিল, এখন সেগুলো ততটা লোভনীয় নয়। বর্তমানে বাজারে সহজেই মিলে যায় বলেই হয়তো ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে। তবে ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরির ক্ষেত্রে কারিগরি দক্ষতার অভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।
ধানের সঙ্গে আমাদের নিবিড় সম্পর্কের কারণেই হয়তো এ অঞ্চলে ধানের চালের খাবার পিঠা, মুঠাজোরা, ভুজা, নাড়–কুটা ভুজা, আন্ধাশা, চিতাই, পুয়া, পান্তা, ক্ষির, রুটি, হালুয়া রসনা বিলাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে এখনো। যদিও বর্তমানে ভাতকেও খাবার থেকে বাদ দেবার চিন্তাভাবনায় মত্ত হচ্ছেন কেউ কেউ! এসব খাবারের সঙ্গে আরো পথখাবার যেমনÑ আদরকি, দেলখোশ, কদমাবালা, ফুলারি, মিষ্টিবড়া, ঝুরি, জিলাপি, যেগুলো ধান উঠলে বাহারি হাঁকডাকে বিক্রি করতে আসত। বাঁহুকে ঝুলিয়ে অথবা বড় ডালি মাথায় করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যে প্রবলভাবে মিশে গেছে কালাইরুটি ও কালাইয়ের আটা দিয়ে তৈরি কুমরোর বড়ি। কালাইয়ের রুটি তো পরিবারের হেঁসেল থেকে রেস্টুরেন্টেও দখল নিয়েছে। আর কুমরোর বড়ি বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। যদিও এখন আগের মতো করে বাড়িতে আর এসব অনেকেই বানান না। প্রয়োজনীয় উপকরণও থাকে না। আবার ইচ্ছে বা রুচির অনীহাও থাকে।
অর্থাৎ যদি এখন খাবারের একালসেকাল তুলনা করি, তাহলে অনেকটা পরিবর্তন লক্ষণীয়। বর্তমানে তৈরি খাবারের সহজলভ্যতা আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্থানটাকে দখল করে নিয়েছে বললে ভুল হবে না। আর একক পরিবারের একা হাতে সবটা করা বেশ কঠিন। আর সাধারণত মায়েরা সন্তানের জন্য, স্বামীর জন্য যত স্বপ্ন ও দরদ দিয়ে খাবারগুলো তৈরি এবং পরম মায়ায় যত্ন করে তা যখন পরিবেশন করে; কিন্তু আগ্রহ ও রুচির ঘাটতি দেখে অনেক মা এমনিতেই থেমে যায়। ফলে সেই সাধের খাবারগুলো তখন বিষাদই এনে দেয়।
তারপরও বলব, আগে যখন বাড়িতে এসব ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি হতো, তখন এসবের ঘ্রাণে তো অর্ধভোজন হয়েই যেত। পিঠার ভাপ দেখে অনেকের জিভে জল আসত, আনন্দে মনটা নেচে উঠত। আর আন্ধশা ছাড়া তো ঈদ যেন ভাবায় যেত না। একসময় ক্ষির রুটি ছিল বিয়ের অনুষ্ঠানের একমাত্র নাস্তা। এখন সেই অনুষ্ঠানের পাতে বলতে গেলে ক্ষির রুটির কোনো চিহ্নই থাকে না। মুড়ি মুড়কি খই মোয়া খিচুড়ি এসব ছিল খুবই মোহনীয় খাবার। এখনো এগুলো আছে, তবে রূপান্তরিত হয়েছে।
এখন বাড়িতে খোলায় মুড়িভাজা হয় না বালু দিয়ে। খই ভাজাও হয় না। বাছাবাছির ঝামেলাও থাকে না। কিনে পাওয়া যায় হাট-বাজারে। পিঠা তৈরিতে যে শ্রম আর প্রস্তুতি কিংবা কারিগরি দক্ষতা সেটাও হারাতে বসেছে বললে কমই হবে। আটার নাড়ু বানানোর সময় যে ঘ্রাণটা পাওয়া যেত, এখনো মাঝেমধ্যে মনে হয় স্বাদটা নিতেই হবে। প্রবল চাহিদা তৈরি হয় মনে। চালভাজা যখন গুড় তিল দিয়ে ঢেঁকিতে কুটা মানে ভাঙা হয় তখন তার লোভনীয়, মোহনীয় আকর্ষণ যে কাউকে পাগলপ্রায় করে তুলত।
আঁইখ্যার ক্ষিরের যে রূপ, রঙ, স্বাদ গন্ধ তার বর্ণনা দিতে গেলে সেই ছবিগুলো ভেসে উঠবে মানসপটে। হাতে আঁইখ্যা গড়ার যে দৃশ্য সেটা দাদি, নানি, মা, খালা, ফুপু, চাচি, বোন, ভাবির যৌথ প্রচেষ্টায় অন্যরকম স্বাদ এনে দেয়। তাছাড়া এর মাধ্যমে সম্প্রীতি সৌহার্দ্যও তৈরি হতো।
এখন এসব খাবার হারিয়ে যেতে বসেছে। স্বাদ আহ্লাদও হারাতে চলেছে। মানুষ সামাজিক জীব ফলে সম্মিলিতভাবে যে আনন্দ, উল্লাস, ধৈর্য, রাগ, লোভ, লালসা সমঝোতা সমাধান তাতেই মিশে আছে ঐতিহ্যবাহী খাবারের রূপ, রস, স্বাদ, ঘ্রাণ, ভালো লাগা, ভালোবাসা মায়া, প্রীতি। যেন সম্পর্ক আর সামর্থ্যরে মাঝেই আমাদের আগ্রহ, সংগ্রহ, বিদ্রোহ লুকিয়ে আছে।
ঝাল, পাটিসাপটা, হালুয়া, পুলি, ঝুরি, জিলাপি ছিল একসময়ের পরম পাওয়া। কাঁড়ির পালাতে হালুয়া চিতাইয়ে পাইট কৃষানের উদরপুর্তি আর ঢেকুর তোলার যে প্রশান্তি তা এখন ততটা চোখে পড়ে না। এখন অনেক মুখরোচক দামি সস্তা খোলা প্যাকেটজাত খাবার চোখের সামনে হাতের কাছে থাকে বলে ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো সেকেলে মনে হয়। আর এত খাটনি কেন করতেই বা যাবে কেন, যখন আরো বেশি মুখরোচক খাবার সহজেই কিনে পাওয়া যায়।
বর্তমানে আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে ঐতিহ্যেরও পরিবর্তন হয়েছে। সভ্যতার কাছে সংস্কৃতি পাল্লা দিয়ে চলছে না, থেমে গেছে। তবে স্মৃতিচারণে যে খাবারগুলোর উল্লেখ করা হলো, তা যেমন স্বাদের মজাদার ও আনন্দদায়ক ছিল, কিন্তু এসব নিয়ে উত্তরসূরিদের কাছে গল্প করার সময়-সুযোগও যেন হয়ে উঠে না। আত্মীয়-স্বজনের নিবিড় সান্নিধ্যটাও যেন কমে যাচ্ছে। বড় হাঁড়িতে বেশি খাবার খাওয়ার অধিক লোকজনের আনন্দ-উল্লাস এখন আর হয় না।
দামি উপঢৌকন পাওয়ার আশায় এখন নিমন্ত্রণের তালিকা থেকে বাদ যায় আন্তরিক ত্যাগী মমতামাখা আত্মীয়-স্বজনরা। যারা হয়তো ড্যামাগমের (গম সিদ্ধ) ঘাঁটি খাইয়ে মানুষ করেছে অনেক যত্ন কষ্ট আর আদর করে। বাদপড়াদের মুখ থেকে শোনা যায় ঘাঁটি, গম ভাজা পিসা আর নুনপানি দিয়ে রান্না করে খাওয়ানোর প্রশান্তির কথা।
চাল, গম, ভুট্টা, বদাম, জও দিয়ে তৈরি ছাতুর সেই স্বাদ আর সুবাস ভুলবার নয়। তাতে তেঁতুল ও গুড়ের মিশ্রণ দিয়ে খাওয়ার আনন্দ-সুখটাও হারিয়ে যাচ্ছে। যদিও কিছুটা হলেও চলমান। ভুট্টা পুড়িয়ে খাবার মজাও বিরল বটে। আলু পুড়িয়ে ভর্তা খাওয়া, তিলের খাজা কত কি যে ছিল, আছে, আবার নেইও। আগের মতো সেই আগ্রহ আর লোভনীয় চাহিদা অবশ্য খাবারের সঙ্গে হজমক্ষমতা পরিপাকের জন্য শক্ত নাড়িভুড়ি যেন নরম হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে।
মোটের ওপর বলা যায়, সময়ের সাথে সাথে রুচির পরিবর্তন হতেই পারে। তারপরও স্থানীয় খাবার, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই। হারিয়ে ফেলার মাঝেই ধরে রাখার চেষ্টা থাকার প্রয়োজন। ফলে দৃশ্যমান কিছু চালিয়ে যাবার ব্যবস্থা যেমন দেখা লেখা শোনার মাধ্যমেও করা যায়, তেমনি খাওয়া ও খাওয়ানোর মাধ্যমেও করা যায়।

কবি ও সহকারী শিক্ষক, উত্তর রহনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ