আম রপ্তানি বাড়াতে সংরক্ষণ প্রকল্প ও কিছু কথা

20

সামসুল ইসলাম টুকু

আমের উন্নয়নের জন্য সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই। সম্প্রতি আম রপ্তানি বাড়াতে ঢাকার গাবতলীতে সংরক্ষণ প্ল্যান্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকেই তা বোঝা যায়। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয়ের অস্থির সিদ্ধান্ত, আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবির প্রতি গুরুত্ব না দেয়া এবং যত্রতত্র এই প্ল্যান্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত আম ব্যবসায়ীদের, বিশেষত রপ্তানিকারকদের ভোগান্তি বাড়বে বই কমবে না।
পত্রিকান্তরে জানা গেছে, বাংলাদেশ বিশ্বের প্রধান ১০টি দেশের মধ্যে অষ্টম হলেও আমের গুণগত মান নিশ্চিত না করার ফলে রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় নেই। আর সে জন্যই ঢাকার গাবতলীতে ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বাষ্প তাপ প্রয়োগ প্রযুক্তি সুবিধার প্ল্যান্ট তথা একটি পূর্র্ণাঙ্গ প্যাকেজিং হাউস স্থাপনের উদ্যাগ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি এই প্ল্যান্ট থেকে উদ্যাক্তা বা রপ্তানিকারকরা আম প্রক্রিয়াকরণ করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন। বিষয়টি শিগগিরই একনেকে উপস্থাপন করা হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে।
তবে প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপন ও বাস্তবায়নের পূর্বেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা প্রয়োজন। ২০২০ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় আম উৎপাদিত এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও সাতক্ষীরায় এমন ৩টি প্ল্যান্ট বা প্যাকেজিং হাউস স্থাপনের জন্য কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে স্থান নির্বাচনের দায়িত্ব দেয়। প্রেক্ষিতে ওই অধিদপ্তর স্থান নির্বাচন করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে। কিন্তু কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এ কাজে যথেষ্ট নয় বলে হঠাৎ করে ২০২১ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় ওই নির্দেশ প্রত্যাহার করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে ওই কাজ করার দায়িত্ব দেয় বলে শোনা যায়। কারণ রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন করতে হলে আমচাষ থেকে আম উৎপাদন পর্যন্ত সবকিছুই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করেই করতে হয়। এজন্য আম উৎপাদিত জেলাগুলোর আম ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরা কৃষি অধিদপ্তরের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। হঠাৎ করে ২০২২ সালের জুলাই মাসে জানা যাচ্ছে যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন।
প্রশ্ন হচ্ছে, আমচাষি ব্যবসায়ী রপ্তানিকারকদের সাথে কৃষি অধিদপ্তারের যোগাযোগ একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের। ফলে তাদের সমস্যা সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কেও তারা অনেক বেশি জানে; যা কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের সাথে নেই। তাছাড়া আম সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা থাকার কথা নয়। কারণ তারা মূলত সেচ, সার ও বীজ নিয়ে কাজ করে। অর্থাৎ একটি অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব দিলে হ য ব র ল হওয়াই স্বাভাবিক। শুধু তাই নয়, তাদের সারা দেশে ১০/১৫ হাজার একর জমি ও বহু অবকাঠামো থাকা স্বত্বেও কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন একটি মৃতপ্রায় ও লোকসানি প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া আমচাষি, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের সাথে সম্পর্কহীন একটি প্রতিষ্ঠানকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিলে তা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, ঢাকার গাবতলী কোনো আম উৎপাদন এলাকা নয়। সেখানে এই আম সংরক্ষণ প্ল্যান্ট বা প্যাকেজিং হাউস হতে পারে না। শুধু তাই নয়, সারা দেশের আম ব্যবসায়ীদের ঢাকার শ্যামপুরে যাওয়ার ভোগান্তির কথা বারবার অবহিত করার পরও আবার ঢাকার গাবতলীতে এই প্ল্যান্ট স্থাপন পৃথক কোনো অর্থ বহন করে না। বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে সরকারের সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া, সেটাও বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
তৃতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, যখন যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পরিবেশ দূষণের কারণে ঢাকা পৃথিবীর অন্যতম দূষিত শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, প্রেক্ষিতে ঢাকার অফিস আদালত, মিল ফ্যাক্টরি বিকেন্দ্রীকরণের প্রবল আওয়াজ উঠেছে। তখন আবার এই ঢাকাতেই প্যাকেজিং হাউস স্থাপন করে ঢাকাকে পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা করা হচ্ছে কি? এসব পরিস্থিতি বিবেচনা করে এটাই মনে হওয়া সঙ্গত যে, এই প্ল্যান্ট স্থাপনের ক্ষেত্রেও ভীষণ আমলাতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। গাবতলীর প্রস্তাবিত প্ল্যান্ট কোনোভাবেই রপ্তানিবান্ধব হবে না। অথচ চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, সাতক্ষীরা ও হালে নওগাঁ জেলায় ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হলে সরকারের ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু সেটা যেমন হবে রপ্তানিবান্ধব, তেমনি সরকারের সেবা পৌঁছে যাবে আম রপ্তানিকারকদের দোরগোড়ায়।
অবকাঠামোগত এই সুবিধার জন্য দীর্ঘদিন যাবত আবেদন জানিয়ে আসছে এই জেলাগুলো। অতি দ্রুত পাবে ফাইটো স্যানিটারি সনদপত্র। আর এ সুবিধা পেলে স্বাভাবিকভাবেই চাষিরা অধিক আম উৎপাদনে উৎসাহিত হবে, রপ্তানির পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, প্ল্যান্ট স্থাপনে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এক্ষেত্রে বলা যায়, বহু অনুৎপাদনশীল খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলছে, সুতরাং ১১০ কোটি টাকা নেহায়েতই একটি ছোট অঙ্ক।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। প্রতি কেজি আমের মূল্য সর্বনি¤œ ১০০ টাকা ধরা হলেও এ পরিমাণ আমের দাম হবে ১৮ হাজার কোটি টাকা। যার এক-চতুর্থাংশ সংরক্ষণাগারের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার আম রক্ষা হলে সেটাই হবে দেশের জন্য বড় প্রাপ্তি। তাছাড়া প্ল্যান্ট থেকে সরকার পাবে মোটা অঙ্কের রাজস্ব। সেই সাথে থাকবে অন্যান্য শাকসবজি রপ্তানির সুযোগ। তাই গাবতলীতে প্ল্যান্ট স্থাপনের পূর্বে এ বিষয়গুলো গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।

সামসুল ইসলাম টুকু : প্রবীণ সাংবাদিক ও কলাম লেখক