আমের আঁটি একটি ভোগ্যপণ্য, বর্জ্য নয়

23

জাহাঙ্গীর সেলিম

গত মাসে এক জাতীয় দৈনিকের উপসম্পাদকীয়তে বিস্তারিতভাবে ‘মূত্র বর্জ্য না সম্পদ’ প্রবন্ধটির ওপর আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মূত্রকে বর্জ্য হিসেবে না দেখে সম্পদ হিসেবে প্রায় দুই দশক আগে জাপানের কারিগরি সহায়তায় কুমিল্লার কোটবাড়ীতে অবস্থিত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি-বার্ড আশপাশের কিছু গ্রামে ইকো টয়লেট অবকাঠামো তৈরি ও ব্যবহার করে প্রমাণ করেছে মূত্র পানির সাথে মিশিয়ে স্প্রে ক্ষেতে ইউরিয়া সারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পাশাপাশি মলও উৎকৃষ্ট সার হিসেবে ফসল উৎপাদনে ব্যবহার হচ্ছে। আমার দৃষ্টি অন্যখানে, সহজলভ্য আমের আঁটি বর্জ্য হিসেবে নয়- ভোগ্যপণ্য হিসেবে অবশ্যই বিচার করা উচিত। দেশে বছরে ১৫ বা ২৫ লাখ টন আমের খোলসের মধ্যে ৩ বা ৪ লাখ টনের ওপর অর্গানিক পণ্য শাঁস দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় অনায়াসে যোগ হতে পারে। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে ভোজ্য তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং আমদানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। উপরন্তু প্রতি মাসে দামের ঊর্ধ্বগতি। অথচ আমের আঁটির শাঁস থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদন করে আমদানি প্রবণতা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য চাই গবেষণা, মনমানসিকতার পরিবর্তন, সঠিক ব্যবস্থাপনা, সর্বোপরি সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও অর্থায়ন।
ভোজ্য তেলের বাজারে চরম দুর্ভোগ, অব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়ীদের অত্যধিক মুনাফার প্রবণতার প্রতিফলন দেশবাসী এবার ভালো করে লক্ষ্য করল। বিগত ঈদের আগে থেকে এবং ঈদ উদ্যাপনের পরেও চলমান সংকট কাটেনি। তিন মাসের মধ্যে ভোজ্য তেলের মূল্য দ্বিগুণ বেড়েছে, অবশ্য আরো অনেক ভোগ্য পণ্যের দাম বেড়েছে। কিন্তু ভোজ্য তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতার জন্য ব্যবসায়ীরা আমদানি জটিলতার কথা বলে সাফাই গাওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সরকারের উচিত ধান, চাল, আলু, শাকসবজি, ফলমূল উৎপাদনে সফলতার পাশাপাশি ভোজ্য তেল উৎপাদনে দেশীয় সম্পদ ব্যবহার করে সক্ষমতা বাড়ানো। সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী বলেছেন সরিষার উৎপাদন বাড়াতে হবে। কৃষিমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী মহোদয়দের নিকট অনুরোধ অব্যবহৃত কৃষিপণ্য হিসেবে প্রতি বছর তিন বা চার লাখ টনের ওপর আমের আঁটি থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদনে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। এছাড়াও প্রায় ৫০ হাজার টন খোলস জ্বালানি অথবা অন্য পণ্য উৎপাদন কাজে ব্যবহার করা যাবে।
আম একটি সুমিষ্টÑ সুস্বাদু মৌসুমি ফল। প্রতি বছর মধুমাসের মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় দেশের আপামর জনগণ উদগ্রীব থাকে। এটি হৃদয় হরণ করা মনোলোভা ফল ঘ্রাণে মৌ মৌ করে। দেশের লোকজনের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মৌসুমি ফল। আমের আকর্ষণের পেছনে স্বাদ বর্ণ গন্ধ এবং একইসাথে পুষ্টিমানে পরিপূর্ণ।
আমের চাষ বর্তমানে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। দেশে আমের উৎপাদন ১৫ বা ২০ লাখ টন। ১৫-২০ লাখ টনের মধ্যে চার লাখ টনের ওপর আম উৎপাদিত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবং একক হিসেবে বেশি আম উৎপাদনকারী জেলা। দেড়-দুই দশক আগে দেশবাসী এ জেলার আমের জন্য অপেক্ষায় থাকত। এ জেলায় পাওয়া যায় সবচেয়ে সুস্বাদু আম এবং আশ্বিন মাসেও এখানকার বাগানে আম গাছে ঝুলে থাকে। অবশ্য রাজশাহী, নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া প্রভৃতি জেলায় স্বল্প পরিসরে আমবাগান ছিল। বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের বদৌলতে দেশের প্রায় সব জেলায় মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রধানত আম্রপলি ও রুপালি আম বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে চাষের পরিধি বেড়েছে। আরো একটি আশাপ্রদ এবং একইসঙ্গে ব্যঞ্জনাময় বিষয় হলো, বিগত ৭-৮ বছর থেকে বিদেশে সীমিত পরিমাণে আম রপ্তানি হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অদূরদর্শিতা, অব্যবস্থাপনা, পক্ষপাতিত্ব, রপ্তানিবান্ধব পরিবেশ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার ব্যর্থতার কারণে বিগত বছরগুলোতে রপ্তানি মুখ থুবড়ে পড়ে। কৃষিপণ্য আম দেশের জাতীয় অর্থনীতি ও জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং ভবিষ্যতে এটি অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পণ্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। একক জেলা হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম অর্থনীতির বার্ষিক পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকার উপর। তবে দেশের সামগ্রিক আম অর্থনীতির পরিসংখ্যান এখন পর্যন্ত কেউ চিন্তা করেনি। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে দুই লাখ টন এবং অন্যান্য জেলা থেকে প্রায় সমপরিমাণ আম বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব।
প্রবন্ধের শিরোনাম আমের আঁটি একটি সম্পদ বর্জ্য নয় প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। ১৫-২০ লাখ টন আম থেকে প্রায় তিন বা চার লাখ টন ভেতরে শাঁস পাওয়া যাবে। আঁটি বর্তমানে ৯৯ শতাংশ বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেয়া হয় এবং গ্রাম ও শহরের রাস্তার অলিগলিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এক শতাংশেরও কম নার্সারিতে চারা উৎপাদনে ব্যবহার হয়। ফলে ৯৯ শতাংশ বর্জ্য হিসেবে না ফেলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং একটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। এতকাল এটি উপেক্ষিত থাকলেও এখন সময় হয়েছে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের এবং সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। গবেষণার উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে এবং গবেষণার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হলোÑ ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে অবস্থিত বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, সাধারণ লোকজন সায়েন্স ল্যাবরেটরি নামে চেনে ও জানে। এ তিনটি প্রতিষ্ঠান নানা ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত সামগ্রী গবেষণায় সফলতা রয়েছে। উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বিনামূল্যে উদ্যোক্তাদের হস্তান্তর করে থাকে। তবে প্রবন্ধকারের অবশ্য জানা নেই উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আমের আঁটির পুনর্ব্যবহার বিষয়ে কোনো গবেষণা করেছে কী না। যদি না হয়ে থাকে তাহলে চলতি বছর থেকেই প্রয়োজনীয় উপকরণ অর্থাৎ আঁটি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্যোগসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। তবে বেসরকারি উদ্যোগেও গবেষণায় আশাপ্রদ ফল পাওয়া যেতে পারে।
অর্গানিক উপকরণ আমের আঁটি নানাভাবে আমাদের ফুড চেইনে ব্যবহার হতে পারে। আঁটির শক্ত আবরণের ভেতরের শাঁস নিষ্কাশণ করে যে পেস্ট পাওয়া যাবে তার পরিমাণ কম করে হলেও তিন-চার লাখ টন। সেটি অর্গানিক উপাদান আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এটা প্রমাণিত যে বেকারিতে নি¤œমানের খাদ্য উপাদান ব্যবহার করা হয় এবং বেকারির খাদ্যমান প্রশ্নবিদ্ধ। বিপুলসংখ্যক ভোক্তা জেনে বা না জেনে সেসব সামগ্রী খেয়ে চলেছে। বেকারিতে বিভিন্ন ধরনের বিস্কিট তৈরিতে এই পেস্ট ব্যবহার হতে পারে। চকলেটের প্রতি বাচ্চারা খুব আকৃষ্ট এবং প্রচুর পরিমাণে ভক্ষণ করে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে আমরা জানতে পারি চকলেট তৈরি করতে উচ্ছিষ্ট ও নিকৃষ্টমানের উপাদান ব্যবহার করা হয়। এই অর্গানিক পেস্ট চকলেট তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে। এছাড়া মিষ্টি তৈরিতে এই পেস্ট যথেষ্ট কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায় এ পেস্ট ব্যবহার করে বিস্কিট, চকলেট, মিষ্টি তৈরি করতে অনায়াসে ব্যবহার করছে। শুনে আশ্চর্য লাগতে পারে, তারা বিদেশে এ পেস্ট রপ্তানি করছে এবং ভালো চাহিদা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমাদের দেশে আমের উৎপাদন অনেক বেশি। আমরাও রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি। আঁটি ভেষজ গুণে সমৃদ্ধ, শুকনো আঁটি শীতল নামে পরিচিত কামড়ে খাওয়া যায়, মিষ্টি স্বাদের হলেও কসযুক্ত। শীতল চিবানোর পর পানির স্বাদ হবে সরবতের মতো, যা খাবার অরুচি ও বদহজম উপশম করে। এসব বিষয়ে বোধকরি দেশের খাদ্য পুষ্টি বিজ্ঞান ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এমনকি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জানা নেই।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ঢাকাস্থ পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটে কর্মরত চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডা. আবু তালেব বিগত শতাব্দীর শেষে আঁটির শাঁস থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদন করতে সক্ষম হন। কিন্তু অকাল মৃত্যুর কারণে তার যুগান্তকারী আবিষ্কার হারিয়ে যায়। তারপর থেকে আর কোনো গবেষণার খবর আমার জানা নেই।
উল্লেখ্য, পরিত্যক্ত বর্জ্য পশুর হাড় সংগ্রহ করে দেশে বড় আকারে গড়ে উঠেছে জীবনরক্ষাকারী ক্যাপসুলের খোলস তৈরির ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো সেই খোলস নিয়ে বিভিন্ন ক্যাপসুল তৈরি করছে, অর্গানিক সামগ্রী ব্যবহারের কারণে বিদেশেও এর চাহিদা রয়েছে এবং রপ্তানি হচ্ছে। আরো এক অপ্রচলিত কৃষিপণ্য চালের কুড়া দিয়ে ভোজ্য তেল উৎপাদন করা হচ্ছে এবং এটি বহুল প্রচলিত ভোগ্যপণ্য। এভাবে গার্মেন্টসের পরিত্যক্ত কাপড় দিয়ে দেশের অনেক স্থানে ছোট বড় কারখানা গড়ে উঠেছে যা আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। দেশে বাজেটের আকার প্রতি বছর লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। বাজেট ঘাটতির মোকাবিলার জন্য অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে আমের আঁটি সম্ভাব্য মূল্যবান পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

জাহাঙ্গীর সেলিম : গবেষক ও লেখক