আমার চোখে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি

3

আজিজুর রহমান শিশির

ঠিক কবে থেকে দেখছি মনে পড়ে না। তবে যখন প্রথম দেখা হয়, তখন পরিসরটা বেশ ছোটই ছিল। দুয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে চলছিল প্রতিষ্ঠানটি। আর এখন বাস্তবেই একটি বটগাছ। যে কিনা তার ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে আপনগতিতে অপার সম্ভাবনায় বিরামহীন এগিয়ে চলেছে।
বলছি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির কথা।
আমি তখন একটি সাপ্তাহিক কাগজে চাঁপাইনবাবগঞ্জে কাজ করতাম। সেসময় পরিচয় হয় প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হাসিব হোসেনের সঙ্গে। প্রকল্পগুলোর পরিচিতিমূলক সভায় কিংবা সেমিনারের মাধ্যমে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের ডেকে অবহিত করতেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে ছিল তার সুসম্পর্ক। মাঠপর্য়ায়ের কাজও তিনি আমাদের দেখাতেন। প্রয়াসের ভালো কাজের অনেক সংবাদ প্রকাশ করতাম।
সে সময় হাসিব হোসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের পিছিয়ে থাকা হতদরিদ্র মানুষগুলোকে এগিয়ে নিতে তার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমাদের সমাজের যেসব মানুষ ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সামান্য অর্থের অভাবে ছোটখাটো ব্যবসা করতে পারেন না, গ্রামের দরিদ্র কৃষক তার জমিতে ঠিকমতো ফসল ফলাতে পারেন না, তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণসুবিধার কথা। এছাড়াও অসহায় পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, বয়স্কদের দেখভাল করা, যুবদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশু ও নারী নির্যাতন বন্ধ, বিশেষ করে পারিবারিকভাবে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ, মানবপাচার, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করার আগ্রহের কথা।
কিন্তু এতসব কাজ করতে গেলে মানুষের মনে জায়গা করে নিতে হবে; আর তাই তিনি তার ইচ্ছা পূরণে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস সৃষ্টি করেন। গ্রহণ করেন বিভিন্ন কর্মসূচি। শুরুর প্রথম থেকেই তিনি নিজে যুক্ত হয়ে যেতেন সব কাজে। গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। তাদের সঙ্গে উঠানে বসে সময় কাটাতেন। তখন তো তার বয়স খুব বেশি ছিল না। তার মতো মানুষ কলেজের শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে এসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে একেবারে মিশে গিয়েছিলেন, যার ফলে মানুষ কিন্তু প্রথম থেকেই তাকে বিশ্বাস করেছে। তিনি খুব স্বচ্ছতার সঙ্গে তার কাজগুলো করেছেন এবং দিন দিন কাজের বিস্তার ঘটিয়েছেন। ওই সময় তিনি একটি পত্রিকা প্রকাশে তার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন।
প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি চাঁপাইনবাবগঞ্জে গড়ে উঠলেও বর্তমানে নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, জয়পুরহাট, বগুড়া, গাইবান্ধা ও দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় কর্মএলাকা বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়েছে। যেখানে প্রায় ৭১টি ইউনিট অফিসের মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রায় ৮ শতাধিক নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
এটা একদিনে হয়নি। এর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। অনেক বাধা এসেছে; কিন্তু সব বাধা অতিক্রম করে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নিয়েছেন ও নিচ্ছেন।
জানা যায়, ১৯৮৮ সালের বন্যায় যখন চাঁপাইনবাবগঞ্জে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়; তখন সেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও অসহায় মানুষদের সেবা ও সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন একদল তরুণ। বিভিন্ন সংগঠন ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ সংগ্রহ করে তা বিতরণ করেন বন্যার্তদের মাঝে। সেই সময়ে কোনো সাংগঠনিক কাঠামো না থাকায় তরুণ দলটি দক্ষ সৈনিকের মতো ভূমিকা রেখে সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়। মানুষের চাহিদাভিত্তিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে তরুণ ছাত্রদেরকে দরিদ্র, বঞ্চিত, অবহেলিত মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নে কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত করা হয়। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি’।
১৯৯৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রয়াস একটি সংগঠন হিসেবে রূপলাভ করে। ১৯৯৬ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের এবং ২০০০ সালের ৭ মে সোসাইটি অ্যাক্টের অধীনে ‘প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি’ নামে নিবন্ধিত হয়, যার নিবন্ধন নং : রাজ-এস-৪৯/২০০০। এছাড়াও এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর অধীনে নিবন্ধীকরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলে ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল নিবন্ধন (নং-১৯২৩) করা হয় এবং পরবর্তীতে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) অধীনে ২০০৮ সালের ১৪ মে নিবন্ধন করা হয়, যার সনদ নং : ০০৯৭৮-০০৯৮৬-০০২৪৮।
এরপর প্রয়াস আর পেছনে তাকানোর সুযোগ পায়নি। শুধুই সামনের দিকে এগিয়ে চলা। প্রয়াস তার সহযোগী সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেÑ ‘প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট’, কমিউনিটি রেডিও ‘রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম’ ও ‘প্রয়াস হেলথ কেয়ার’। এই প্রয়াস হেলথ কেয়ার বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহরের শান্তি মোড়ে ‘প্রয়াস হসপিটাল’ নামে চালু রয়েছে। যেখানে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
রেডিও মহানন্দা জেলার সামাজিক উন্নয়নে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং এর প্রচার ও প্রসারে সক্রিয় থেকে সাধারণ মানুষের আকুণ্ঠ ভালোবাসা ও প্রশংসা কুড়িয়েছে। একেবারেই প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে রেডিও মহানন্দা।
অন্যদিকে জেলার কৃষ্টি-কালচার তুলে ধরার চেষ্টা করছে প্রয়াস ফোক থিয়েটার ইনস্টিটিউট। এ অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতিসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে গবেষণা ও চর্চাও চালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি।
এছাড়াও হাসিব হোসেন তার নিজ অর্থায়নে দৈনিক ‘গৌড় বাংলা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করছেন। জেলার অন্যতম দৈনিক এই পত্রিকাটি ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে যাত্রা শুরু করে অদ্যবধি চালু রয়েছে। এর সম্পাদক ও প্রকাশক তিনি। এর মাধ্যমে নীরবে-নিভৃতে এক ধরনের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন হাসিব হোসেন। তার সেদিনের ইচ্ছা তিনি পূরণও করেছেন। তিনি বেতন দিয়ে আমাদের মতো বেশ কয়েকজনকে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ হচ্ছে কৃষিনির্ভর দেশ। কৃষিপ্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ সেক্টরসহ কৃষি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। কৃষিজ পণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণে উদ্যোগী হয়ে বহুমুখী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রয়াস এগ্রো যাত্রা শুরু করেছে।
বলা যায়, কৃষিভিত্তিক কার্যক্রম দিয়েই প্রয়াসের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ‘প্রয়াস এগ্রো’ সে কাজটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রয়াস এগ্রোর উদ্যোগে নার্সারি, ভার্মি কম্পোস্ট, ট্রাইকো কম্পোস্ট, নিরাপদ ফল উৎপাদনে ইকোলিজিক্যাল গার্ডেন, মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে ‘বীজ ডিলারশিপ’, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের ব্রিডিং খামার, ভেড়া (গাড়ল) ব্রিডিং খামার, টার্কি প্যারেন্টস্টক ও ব্রিডিং খামার, কুচিয়া ব্রিডিং খামার, দুম্বা ব্রিডিং খামার, ডেইরি ফার্ম, প্রয়াস মধু, ড্রাই ফুড প্রসেসিং কারখানা ইত্যাদি স্থাপন করা হয়েছে।
প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলো হচ্ছেÑ ‘শিখনের মাধ্যমে নিরাপদ আম সম্প্রসারণ প্রকল্প’ শীর্ষক টেকসই উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্প (এসইপি), প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, টার্কির খামার প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি, দেশী উন্নত জাতের ও সংকর জাতের ভেড়া পালন ও সংরক্ষণ এবং পারিবারিক ও প্রজনন / প্রদর্শনী খামার পর্যায়ে এর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের কৌলিকমান সংরক্ষণ এবং পারিবারিক ও প্রজনন খামার পর্যায়ে এর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, প্রাকৃতিক উপায়ে কুচিয়ার বংশবিস্তারের সুযোগ এবং পরিবারভিত্তিক কুচিয়া খামার স্থাপনের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রকল্প, দ্বিস্তর অর্চার্ড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদ গৌড়মতি আম ও মাল্টার উৎপাদন এবং সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রকল্প।
এছাড়াও প্রয়াসের রয়েছে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম। এই কার্যক্রম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গ-ি ছাড়িয়ে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, জয়পুরহাট, বগুড়া, গাইবান্ধা জেলাতেও পরিচালিত হচ্ছে। এই ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের বহু পরিবার প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ঋণের পাশাপাশি সদস্য পরিবারগুলোর জীবন মানোন্নয়নে বিভিন্ন আয়বর্ধক কাজেও তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। বেশ কিছুদিন আগে প্রয়াসের এক সদস্য পরিবারের গৃহকর্তা বলেছিলেন, প্রয়াসের কারণেই তার মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে, হয়েছে কর্মসংস্থান।
আর্থ-সামাজিক কাজগুলোর মধ্যে প্রয়াসের ভিক্ষুক পুনর্বসান কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য একটি কর্মসূচি। এখন পর্যন্ত ১৮ জনেরও অধিক ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
পরিশেষে এটুকুই বলব, সেই কবে প্রয়াসকে দেখেছি এবং গৌড় বাংলায় হাসিব হোসেনের অধীনে কাজ করতে এসে এখন অনেকটাই কাছ থেকে দেখছি। ওই যে শুরুতে বলছিলাম, প্রয়াস এখন একটি বটগাছ। সত্যিই প্রয়াস এখন বটগাছ। হাসিব হোসেনের হাত ধরে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরম মমতায় প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি নামের এই বটগাছটি আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়েছে, তার ব্যপ্তি আরো বিস্তৃত হোক, আরো শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হোক, পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হোক, দারিদ্র্য বিমোচনে আরো জোরালো ভূমিকা রাখুক ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই শুভ কামনা।

আজিজুর রহমান শিশির : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক গৌড় বাংলা