আমনুরা হরিজন পল্লী : জীবনমান উন্নয়নে দ্রুতই পদক্ষেপ নেয়া দরকার

26

মোস্তাক হোসেন

বিশ্ব সভ্যতার বিকাশের পর বিভিন্ন পেশাজীবীর সূচনা হয়। সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে সেই পেশাজীবীর মেধা-মননের ব্যাপকতা পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। সভ্যতার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির সময় বিশাল কর্মযজ্ঞের কর্মচঞ্চলতা সঠিকভাবে নিরূপণে বিভিন্ন পেশা বা কর্মজীবীর উদ্ভব ঘটে। পাশাপাশি শাসক ও শোষিত শ্রেণি দৃশ্যত হয়, যার মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান বিদ্যমান। সেই সভ্যতাকে আরো এগিয়ে নিতে এক ধরনের শ্রমশ্রেণির আবির্ভাব হয়। সেই শ্রমশ্রেণির আন্তরিক স্পর্শে চাকচিক্য পরিবেশ সভ্যতা দেখতে পায়। সভ্যতার দৃশ্যত চাকচিক্যের ঝলকানির পেছনে তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার বিশেষ প্রয়োজন হয়। দিন শুরুর প্রারম্ভে সবাই যখন ক্লান্তির অবসনে আচ্ছন্ন, সেই সময় এই বিশেষ পেশাজীবীরা সদ্য সমাপ্ত দিনের আবর্জনা বা অপরিচ্ছন্ন জায়গাগুলো পরিচ্ছন্ন করে। এই পরিচ্ছন্নতার জন্য আবার ফিরে পায় নতুনভাবে কর্মোদ্দীপনাময় পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ প্রাপ্তির পর কেইবা মনে রাখে তাদের কথা বা তাদের অবদান। এই পরিচ্ছন্নতায় কর্মরত গোষ্ঠীরাই হচ্ছে ‘হরিজন সম্প্রদায়’, যাদেরকে বর্তমানে বলা হচ্ছে ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা শহর বা গ্রাম সকল ক্ষেত্রেই অপরিচ্ছন্নতাকে দূর করার মধ্যদিয়ে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখতে তৎপর। অথচ তাদের থাকার পরিবেশ বিবেচনা করলে দেখা যায় যে মানবিকতার প্রাপ্যতা কিরূপ নি¤œগামী। তারা বাস করে অপরিচ্ছন্ন, ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। সাঁওতাল ও হরিজনদের অধিকার নিয়ে কাজ করার কারণে তাদের পরিবেশ সম্পর্কে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় প্রতিটি হরিজন পল্লীর চিত্র একইরকম। তাদেরকে ঘিঞ্জি পরিবেশে, ঠাসাঠাসিভাবে বসবাস করতে হয়। জনসংখ্যার তুলনায় ঘরের সংখ্যা কম। শুধু বসবাসের জন্য যে ঘরের সংকট তা কিন্তু নয়। পল্লীতে বসবাসরত জনগণের পয়ঃব্যবস্থাপনারও বেহাল দশা। সকাল বেলা গণশৌচাগার ব্যবহারে লাইন ধরতে হয়। এ অবস্থায় পড়তে হচ্ছে কেবল অপ্রতুল শৌচাগার থাকায়। হরিজন পল্লীর সামনে দেখা যায়, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। পল্লীর আশপাশে ড্রেনের নোংরা পানির জলাবদ্ধতা যেন তাদের ভাগ্য থেকে সরতে চায় না। এছাড়াও রয়েছে খাবার ও ব্যবহার পানির সংকট।
এমনই একটি সংবাদ চোখে পড়ল দৈনিক গৌড় বাংলা পত্রিকায়; যা প্রকাশ হয়েছে গত ১৪ মার্চ। সাংবাদিক সাজিদ তৌহিদ হরিজনদের জীবন-যাপনের ওপর ‘আমনুরা হরিজন পল্লী : মানসম্মত জীবনযাপন কবে গড়ে উঠবে?’ শিরোনামে একটি বিশেষ নিবন্ধ লিখেছেন। নিবন্ধটিতে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আমনুরা ঝিলিমবাজার সংলগ্ন রেলওয়ে হরিজন পল্লীতে বসবাসরত ১৫ হতে ১৬টি পরিবারের দুর্ভোগের বর্ণনা তুলে ধরেছেন। সেই পল্লীতে হরিজন ছাড়াও রয়েছে প্রায় ৩০/৩৫টি অন্য ধর্মের অনুসারী পরিবার রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০টি পরিবারই রয়েছে চরম দুর্ভোগে। কারণ হিসেবে নিবন্ধটির বর্ণনায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা, ড্রেন ভেঙে যাবার ফলে নোংরা পানির জলাবদ্ধতা ও খাবারসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার্য পানির সংকট মানব জীবনযাপনের চরম দুর্ভোগের কথায় উঠে এসেছে।
মানবিক জীবনে দৈনিক শৌচাগার ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর ব্যত্যয় হলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে হবে। কিন্তু এই আমনুরা রেলওয়ে হরিজন পল্লীর দশা এতই খারাপ যে, এখানে পয়ঃকার্য সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় শৌচাগার রয়েছে একেবারেই নগণ্য। এদের ব্যবহারের জন্য মাত্র দুটি জরাজীর্ণ ও অনেক পুরাতন শৌচাগারই সম্বল। সেইগুলো দিয়েই সারতে হয় শৌচাগারের কাজ। ওই শৌচাগার দুটি সেখানকার হরিজন পল্লীর নারী-পুুরুষই ব্যবহার করে থাকে। যার একটি পুরুষ ও অপরটি নারীরা ব্যবহার করে। ভাববার বিষয়, এতগুলো নারী-পুরুষের জন্য দুটি শৌচাগারই কি যথেষ্ট। বিষয়টি মানবিক দিক দিয়ে ইতিবাচক ভাবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাদের সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর জীবন-যাপন বা মানবিক কথা বিবেচনা নিয়ে স্থানীয় সরকার পল্লীটির পয়ঃব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিলে পল্লীটিতে বসবাবসরত নাগরিকদের দুর্ভোগ হ্রাস ও মানবিক জীবনে উপকার হতো।
এছাড়াও পল্লীটির আশপাশে আবদ্ধ নোংরা পানি জীবনযাপনকে করেছে দুর্বিষহ। এই আবদ্ধ নোংরা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। উপরন্তু সড়কের ড্রেনের নোংরা পানি এসে পড়ছে এই জায়গায়। কারণ ড্রেনটি অনেকদিন সংস্কার করা হয়নি। তার ওপর দোকানপাট বসানোসহ হোটেলের ময়লা-আবর্জনা ফেলে বন্ধ হয়ে যাবার ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি। যার দরুন পল্লীটি থেকে মেইন সড়কে ওঠার একমাত্র সরু রাস্তাটি নোংরা পানি দ্বারা ডুবে থাকে এবং তা ডিঙোতে হয় গোড়ালি পানি ভেঙে। আবার ওই অঞ্চলের শিশুরা খেলাধুলা করতে গিয়ে আবদ্ধ নোংরা পানি ঘেটে ফেলায় চর্মরোগে ভুগে থাকে। এই পরিস্থিতিটিও দৃষ্টিযোগ্য।
অন্যদিকে খাবার ও ব্যবহার্য পানির দুরবস্থাও কম নয়। ৫০টি পরিবারের জন্য রয়েছে কেবলমাত্র একটি মটরচালিত মিনি ওয়াটার পাম্প। যা কিনা সরকারিভাবে পাওয়া। এর মাধ্যমে পাইপলাইন দিয়ে প্রতি পরিবারকে পানি সরবরাহ করা হয়। সেই পাম্পটি একবার বিকল হয়ে পড়েছিল। তখন পল্লীবাসীরা জীবন বাঁচানোর তাগিদে নিজেরা চাঁদা তুলে মেরামত করিয়ে তাদের পানির চাহিদা পূরণ করেছে। এতগুলো পরিবারের জন্য একমাত্র মিনি ওয়াটার পাম্পটি যথেষ্ট নয়। কারণ একে তো বরেন্দ্র অঞ্চল, তার ওপর গ্রীষ্মকালে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। এতে ওখানে থাকা পাম্প দিয়ে পল্লীবাসীর সকলের পানির চাহিদা মেটানো সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। আগে পাশে থাকা পুকুরের পানিতে অন্যান্য কাজকর্ম সারছিল তারা। এখন পুকুরটি পাশেই নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরে যাবার ফলে একমাত্র পাম্পটিই তাদের ভরসা। এ থেকে উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে পাম্পব্যবস্থাপনায় যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
পল্লীটির দুরবস্থা সচক্ষে বা ভিডিও ফুটেজে দেখলে অনুধাবন করা যায় তাদের কী দুর্ভোগ। এই দুর্ভোগের চিত্র সকলের দৃষ্টিগোচর করার প্রয়াস হিসেবে দৈনিক গৌড় বাংলার পাশাপাশি রেডিও মহানন্দা তাদের অনলাইনে ভিডিও প্রতিবেদন প্রচার করেছে। প্রতিবেদনটির মাধ্যমে জানতে পারলাম যে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের কোনো এক ব্যক্তি পল্লীটি ঘুরে এসেছেন। যদিও এখনো আমনুরা ঝিলিমবাজার সংলগ্ন রেলওয়ে হরিজন পল্লীতে বসবাসরত জনগণের সমস্যার সমাধানে কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। তথাপিও তারা আশায় আছে অচিরেই দুর্ভোগ থেকে নিষ্কৃতি পাবে। তাদের সাথে সহমত জ্ঞাপন করে বলব, আমনুরা হরিজন পল্লীর জীবনমান উন্নয়নে দ্রুতই এ সমস্যাগুলোর সমাধানে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

মোহা. মোস্তাক হোসেন : কলাম লেখক ও শিক্ষক, আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ