আবাসিক ব্যবহার নিরুৎসাহে বাড়ানো হচ্ছে গ্যাসের দাম

88

gasআগামী বছরের শুরু থেকেই আবাসিক খাতে বাড়ছে গ্যাসের দাম। মূলত রাজস্ব বাড়াতে এবং গ্রাহক পর্যায়ে আবাসিকে গ্যাস ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতেই ৫০ শতাংশ দাম বাড়ানো হচ্ছে। একই সাথে বাড়ছে সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দামও। চলতি মাসেই গ্যাসের নতুন মূল্যহার ঘোষণা করা হবে এব আগামী বছরের শুরু থেকেই ওই বর্ধিত মূল্য কার্যকর হবে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে গ্যাসের মজুদ কমে আসায় রান্নার কাজে তার ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে চাচ্ছে সরকার। বিপরীতে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে এলপি গ্যাস ব্যবহারে। একই সাথে সিএনজি স্টেশন থেকে শিল্পে অবৈধ গ্যাস সরবরাহও বন্ধ করতে চাচ্ছে সরকার। ওই কারণেই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হচ্ছে খাতে গ্যাসের দাম। তাছাড়া গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোও আবাসিকে রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ৮৪ ও সিএনজির ৪৮ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। বর্তমানে আবাসিকে সিঙ্গেল বার্নারের (এক চুলা) জন্য গ্যাসের মূল্য পরিশোধ করতে হয় মাসে ৬০০ টাকা। আর ডাবল বার্নারের (দুই চুলা) পরিশোধ করতে হয় ৬৫০ টাকা।
সূত্র জানায়, দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস উৎপাদনে নিয়োজিত তিনটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি (আইওসি) রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার সান্তোস, যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন ও যুক্তরাজ্যের তাল্লো। বিতরণ কোম্পানিগুলো ওসব কোম্পানির কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনে গ্রাহক পর্যায়ে কম দামে বিক্রি করে। তাছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ১৯৯৩ সালে জারি করা ২২৭নং এসআরও অনুযায়ী আইওসি গ্যাস শুল্ক ও ভ্যাটমুক্ত। কিন্তু গতবছরের শুরুতে এনবিআর ওই এসআরও স্পষ্টীকরণ করে পেট্রোবাংলার কাছে গ্যাস বিক্রির অর্থ থেকে সম্পূরক শুল্ক ও মূসক বাবদ ৫৫ শতাংশ রাজস্ব দাবি করে। সেই প্রেক্ষিতে সব ধরনের গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ৮ মাসের মাথায় বিতরণ কোম্পানিগুলো গত ৩০ মার্চ নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। তাতে আবাসিকে দুই চুলার জন্য মাসিক বিল বিদ্যমান ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ ও এক চুলার জন্য ৬০০ টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ১০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়। আর আবাসিকে মিটারযুক্ত গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটারের দাম ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ৫৩ পয়সা প্রস্তাব করা হয়। তাছাড়া অন্যান্য গ্যাসের মধ্যে বিদ্যুতে প্রায় ৩২ শতাংশ, সারে ৩৬ শতাংশ, ক্যাপটিভে ১২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ, শিল্পে ৫৬ শতাংশ, বাণিজ্যে ৬৭ শতাংশ এবং চা বাগানে ৬৮ শতাংশ দাম বাড়ানোর আবেদন করে বিতরণ কোম্পানিগুলো। আর বিতরণ কোম্পানিগুলোর আবেদনের ওপর গত আগস্টে গণশুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। শুনানিতে বিতরণ কোম্পানি ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের বক্তব্যে আইওসি গ্যাস শুল্ক ও ভ্যাটমুক্ত থাকলে নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না বলে উঠে আসে। কিন্তু রাজস্ব বাড়াতে আইওসি গ্যাসে শুল্ক ও ভ্যাট যুক্ত করার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে সব ধরনের গ্যাসের দামই বিভিন্ন হারে বাড়ানো হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, গ্যাস উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে দু-একটি ছাড়া প্রায় সব কোম্পানিই লাভজনক অবস্থানে রয়েছে। চাহিদার তুলনায় অনেকেরই রাজস্ব উদ্বৃত্তও রয়েছে। আর যেসব কোম্পানির রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে তাও খুব সামান্য। ফলে বিভিন্ন মহল থেকেই ওই ঘাটতি সমন্বয়ে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু তারপরও গ্রাহক ও বিতরণ কোম্পানি উভয়ের দাবির যৌক্তিকতা মূল্যায়ন করেই গ্যাসের নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হচ্ছে। সর্বশেষ গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। সে সময় সব ধরনের গ্যাসের দাম গড়ে ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বাড়ানো হয়। আবাসিকে এক চুলার জন্য গ্যাসের দাম ৪০০ টাকার বদলে ৬০০ ও দুই চুলার ক্ষেত্রে ৪৫০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ টাকা করা হয়। তাছাড়া মিটারভিত্তিক গ্যাসের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট ৫ টাকার জায়গায় ৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আর ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৪ টাকা ১৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৬ পয়সা, শিল্পে ৫ টাকা ৮৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৭৪ পয়সা, বাণিজ্যে ৯ টাকা ৪৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৩৬ পয়সা ও চা বাগানে ৫ টাকা ৮৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৪৫ পয়সা করা হয়। তবে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে ব্যবহৃত ঘনমিটার গ্যাসের দাম যথাক্রমে ২ টাকা ৮২ পয়সা ও ২ টাকা ৫৮ পয়সায় অপরিবর্তিত রাখা হয়। বর্তমানে বিদ্যুৎ, শিল্প, আবাসিকসহ সব খাত মিলে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩২০ কোটি ঘনফুট। তার বিপরীতে দেশী ও আইওসি কোম্পানিগুলো সরবরাহ করছে ২৭০ কোটি ঘনফুট। আর উৎপাদিত গ্যাসের সিংহভাগ ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ খাতে। তাছাড়া আবাসিকে ব্যবহার হয় ১৩ দশমিক ৪৭ ও সিএনজিতে ৫ শতাংশ।
এদিকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের মজুদ দিন দিন কমে আসছে। ফলে তার ফলপ্রসূ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য একটি যৌক্তিক দাম নির্ধারণ হতে পারে। কিন্তু তা যেন সহনীয় পর্যায় অতিক্রম না করে। কারণ সহনীয় পর্যায়ে গ্যাসের দাম না থাকলে দৈনন্দিন জীবন ও পরিবহন খাতে নৈরাজ্য দেখা দেবে।
অন্যদিকে এই প্রসঙ্গে বিইআরসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মাকসুদুল হক জানান, বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব ও গণশুনানিতে উঠে আসা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নতুন মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে। আশা করা যায় চলতি মাসের মধ্যেই গ্যাসের নতুন মূল্য নির্ধারণ চূড়ান্ত করা হবে এবং তারপর তা ঘোষণা করা হবে।