আইনগত সহায়তা প্রদান আইন ’২০০০

190

মো. হাসিব হোসেন

Hasib PP new Pic

উন্নত দেশগুলো থেকে অনেকটাই পিছিয়ে বাংলাদেশ। এখানে জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে অনেক কিছু করার আছে। দেশের শতকরা ৭০ ভাগ নারী ও শিশু অশিক্ষা ও দারিদ্রের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করে থাকে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত। অনেক ক্ষেত্রেই তারা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য আমাদের দেশ অনেক ক্ষেত্রেই অসমর্থ হয়েছে। অথচ সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে এমনটাই বলা আছে। কিন্তু দেশের দরিদ্র-অর্ধশিক্ষিত-শিক্ষিত বিচারপ্রার্থীদের যখন নিজেদের দেওয়ানী বা আইনী অধিকার রক্ষার্থে অর্থ বা সচেতনতার অভাবে বা সামাজিক প্রভাবহীন মানুষ হিসাবে আইনগত সহায়তা পান না অথবা আইনজীবি নিয়োগ দিতে পারেন না কিংবা আদালতে আসা-যাওয়ার খরচ পর্যন্ত বহন করতে পারেন না। এমন ক্ষেত্রে আইনগত সহায়তার অভাবে আইনী সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন অনেক মানুষ।

প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললে বা রেডিও-টিভিতে কান পাতলে বা চোখ রাখলে চোখে পড়ে দরিদ্র বা অসহায় মানুষের একাংশ বিশেষ করে নারী ও শিশুরা শিকার হচ্ছে পাচারের, এসিড নিক্ষেপের, ধর্ষণ, যৌতুকের কারণে হত্যা, অপহরণ ইত্যাদির। এই সব দরিদ্র-অসহায় নির্যাতিত মানুষের জন্য প্রণীত হয়েছে বিভিন্ন আইন। যেমন- পারিবারিক আদালত আইন ১৯৮৫, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ ইত্যাদি। দারিদ্র, অস্বচ্ছলতা ও অসচেতনতার কারণে অনেক মানুষ এই সব আইনের আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে না। মামলা মোকদ্দমার ব্যয় ভার বহন করে আদালত পর্যন্ত যেতে পারেন না অধিকাংশ মানুষ। হয় হয়রানির শিকার, নয়তো জেল-জরিমানা হয় বা বিচারকের রায় যায় তার বিপক্ষে। এসব অসহায় মানুষকে হয়রানি বা ন্যায় বিচার বঞ্চিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন আইন সহায়তা প্রদান। সাধারণ ভাবে আইনগত সহায়তার অর্থ হচ্ছে আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায় সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ ব্যক্তিগণকে তাদের আইনগত অধিকার রক্ষা এবং নিশ্চিত কল্পে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা প্রদান করা।

বাংলাদেশের সংবিধানে আছে রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করা, মানুষের সামাজিক ও অর্থনেতিক বৈষম্য বিলোপ করার জন্য নাগরিকদের মধ্যে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকেই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। দেশের দরিদ্র শ্রেণির মানুষ যারা সামাজিক, আর্থিক, প্রভৃতি কারণে আইনের দারস্থ হতে পারেন না, সেই সব নাগরিকদের আইনগত সহায়তার লক্ষ্যে, সংবিধান প্রদত্ত অধিকার রক্ষার জন্যই আইনগত সহায়তার ধারণাটির সৃষ্টি। আমাদের সমাজের বিশাল এই অংশটিকে আইনগত সহায়তা প্রদানের জন্যই “আইনগত সহায়তা প্রদান আইন’ ২০০০” প্রণয়ন করা হয়। ২০০০ সালের আগে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সরকারিভাবে আইনগত সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অগ্রগতি দেখা যায়নি, তবে বেশ কিছু বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান (এনজিও) আইনী সহায়তা দিয়ে আসছিল।

“আইনগত সহায়তা প্রদান আইন” এর সহায়তার সুফল ছড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচারণার। সরকার আইন সহায়তা প্রদান কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজে এর সুফল আরও পাওয়ার আশায় আইনগত সহায়তা প্রদান আইন ২০০০ অধিকতর সংশোধন পূর্বক ‘আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন ২০১৩’ পাস করে। এর পূর্বে ২০১২ সালের ২ মে শ্রমিকদেরকে আইনগত সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যেও শ্রমিক আইন সহায়তা সেল চালু করা হয় যা ঢাকাস্থ শ্রম আদালত ভবনে (শ্রম পরিদপ্তর, শ্রম ভবন, ৪ রাজউক এভিনিউ, ঢাকা) অবস্থিত।

এমনও দেখা গিয়েছে এ আইনের সহায়তায় সত্য উপস্থাপন করে আদালতের রায়ে ‘ফাঁসির দড়ি ছিঁড়ে …’ খালাস পেয়ে এখন স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন। রিপতি কুমার বিশ্বাস, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, সাতক্ষীরা এর বর্ননায় দেখা যায়, দুলাল মিয়া (২৬) কিশোরগঞ্জের এক প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। পারিবারিক সম্মতিতে পার্শ্ববর্তী গ্রামের ইয়াসমিন এর সাথে বিয়ে হয়। তাদের ঘরে লিমন নামে ৩ বছরের একটা পুত্র সন্তান রয়েছে। দরিদ্র হলেও দুলাল ও ইয়াসমিনের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক চমৎকার, তারা একে অপরকে খুব ভালোবাসে। এক কুরবানির ঈদে দুলাল ও ইয়াসমিনের মান-অভিমানের এক পর্যায়ে ঝগড়া শুরু হয়। দুলাল স্ত্রীর ভুল ভাঙ্গানোর জন্য তাকে নিয়ে রাত ১১-১২টার দিকে বড় পাকা সড়ক ধরে এক বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এ সময় যাওয়ার পথে স্ত্রী ইয়াসমিন তাকে নারীসুলভ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অনেক বকাবকি করতে লাগল, দুলাল প্রথমে চুপ করে থাকলেও যখন ইয়াসমিন তার মা-বাপ তুলে গাল দিল, তখন সে আর থাকতে পারল না, ইয়াসমিনের গালে জোরে একটা চড় মারল। এতে ইয়াসমিন আরো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল এবং চলন্ত বাসের নীচে ঝাপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করতে চাইল। এসময় হঠাৎ সামনের দিক দিয়ে একটা বাস আসতে দেখে সে সেদিকে দৌড়াতে লাগল। দুলালও অবস্থা বেগতিক দেখে প্রাণপনে তাকে আটকানোর জন্য পিছু পিছু ছুটল। কিছু দূর দৌড়ে পিছন থেকে দুলাল তার শাড়ীর আঁচল ধরে ফেলল এবং সে আঁচল ধরেই তাকে রুখতে হেচকা টান দিল। দুর্ভাগ্যক্রমে ঐ শাড়ীর আঁচলটা ইয়াসমিনের গলায় প্যাঁচ লেগে গেল এবং সে ছিটকে রাস্তার পাশে পড়ে হাসফাঁস করতে লাগল। দুলাল তাড়াতাড়ি পাশের মসজিদ থেকে বদনায় করে পানি নিয়ে এলো তার চোখে মুখে দেয়ার জন্য। কিন্তু এসে দেখল ইয়াসমিনের শ্বাস ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। তখন সে ইয়াসমিনকে কাঁধে করে ডাক্তারের খোঁজে দ্রুত হাঁটতে লাগল। ৩/৪ মিনিট হাঁটার পরই তার কাঁধ ভারী মনে হলো। সে ইয়াসমিনকে নামাতেই ইয়াসমিন মাটিতে ঢলে পড়ল। ততক্ষণে আসলে ইয়াসমিন মারা গেছে। এদিকে সামনে দিয়ে দুটা লোক লাইট মারতে মারতে আসছে দেখে সে হতভম্ভ হয়ে গেল এবং ভয়ে বৌকে সেখানে ফেলে রেখে দৌড়ে বাড়ী চলে এলো। পরদিন সকালে রাস্তার পাশে ইয়াসমিনের লাশ পাওয়া গেল। ঘটনাটা জানাজানি হয়ে গেল এবং পুলিশ এসে দুলালকে গ্রেফতার করে কোর্টে চালান দিল। দুলাল বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সব কথা অকপটে স্বীকার করে জবানবন্দী দিল। জবানবন্দী দেয়ার সময় সে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগল, তার শিশু সন্তানের জন্য বারবার বিলাপ করতে লাগল। সে তাকে ফাঁসি দেয়ার জন্যও ম্যাজিস্ট্রেটকে বার বার অনুরোধ করতে লাগল। ম্যাজিস্ট্রেট দুলালের কথা বিশ্বাস করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বিষয়টা মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে তদন্ত করে রিপোর্ট দেয়ার জন্য বললেন। তিনি প্রকৃত সত্য জানতে বুঝতে পারার পরও মানবিকতা বিবেচনা না করে গতানুগতিকভাবে দুলালের বিরুদ্ধে চার্জশীট দিয়ে দিলেন। মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে বিজ্ঞ সেসন কোর্টে বিচার কাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে দুলালের শ্বশুর-শাশুড়ীর কাছেও ঘটনাটা পরিষ্কার হয়। দুলাল যে নির্দোষ এবং এটা যে একটা দুর্ঘটনা এ সত্য তাদের বোধগম্য হয়। পক্ষদ্বয়ের এ বাস্তব সত্য উপলব্ধিতে দ্রুত সাক্ষ্য সমাপনান্তে মামলাটির বিচার নিষ্পত্তি হয়। আদালতের রায়ে দুলাল বেকসুর খালাস পায়। তারপর ইয়াসমিনের ছোট বোন রুবীর সাথে দুলালের বিয়ে হয় এবং রুবী তার বোনের ছেলে লিমনকে পুত্র ¯েœহে কাছে টেনে দায়িত্ব নেয়। এখন তারা সুখে শান্তিতেই বসবাস করছে বলে জানা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এটি একটি সত্য ঘটনা এবং এ মামলার আসামী দুলাল গরীব রিকশা চালক হওয়ায় কিশোরগঞ্জ জেল সুপারের পরামর্শে সরকারি আইনী সহায়তা পাওয়ার জন্য লিখিত আবেদন করলে তার আবেদনের ভিত্তিতে জেলা কমিটি সরকারি খরচে একজন আইনজীবী নিয়োগের মাধ্যমে তার মামলাটি পরিচালনা করেন।

সরকার দেশের বিশাল এ অসহায় জনগোষ্ঠীর মামলা মোকদ্দমার ব্যয়ভার বহনের জন্য বিশাল অংকের টাকা বরাদ্দ রেখেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মানুষ এখনও জানেনা তাদের মামলার ব্যয় বহন করছেন স্বয়ং সরকার। আর একই উদ্দেশ্যে দেশের আপামর জনসাধারণকে সরকার আইন সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বিগত ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রী সভার বৈঠকে সরকার “আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০” কার্যকরের তারিখ অর্থাৎ ২৮শে এপ্রিল “জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস” ঘোষণা করেন।

আইনগত সহায়তা প্রদান আইন ২০০০ এর ২(ক) উপ-ধারা অনুযায়ী “আইনগত সহায়তা” অর্থ আর্থিকভাবে অসচ্ছল-সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থীকে আইনগত পরামর্শ প্রদান, আইনজীবির ফিস প্রদান ও মামলার খরচ প্রদানসহ অন্য যে কোন সহায়তা প্রদান। আইনে উল্লেখ আছে যে,
১. কোন আদালতে দায়েরযোগ্য, দায়েরকৃত বা বিচারাধীন মামলায় আইনগত পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান;
২. Code of Civil Procedure, 1908 (Act No. V of 1908) এর Section 89A এবং 89B এর বিধান অনুসারে মধ্যস্থতা বা সালিশের মাধ্যমে কোন মামলা নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারী বা সালিশকারীকে সম্মানী প্রদান;
৩. মামলার প্রাসঙ্গিক খরচ প্রদানসহ অন্য যে কোন সহায়তা প্রদান; এবং
৪. উপরোক্ত উপ-ধারা ১ হইতে ৩ এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত হারে আইনজীবীকে সম্মানী প্রদান;
৫. “আদালত” অর্থ সুপ্রীম কোর্টসহ যে কোন আদালত;
৬. “আবেদন” বা “দরখাস্ত” অর্থ আইনগত সহায়তা প্রাপ্তির আবেদন বা দরখাস্ত;
৭. “বিচারপ্রার্থী” অর্থ কোন আদালতে দায়েরযোগ্য বা দায়েরকৃত দেওয়ানী, পারিবারিক বা ফৌজদারী মামলার সম্ভাব্য বা প্রকৃত বাদী, বিবাদী, ফরিয়াদী বা আসামী। আইন গত সহায়তা প্রাপ্তির যোগ্য (যারা এই সরকারি আইনি সেবা পেতে পারেন)।

আসলে বর্তমানের আইন নাগরিককে সমান আশ্রয় লাভের অধিকার দেয়ার জন্য প্রস্তুত। এখন প্রয়োজন এ সুযোগকে কাজে লাগানোর। তবে এটাও ঠিক যে, সুযোগ মানুষের দোঁড়গোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচারণার। এ জন্য সম্পৃক্ত করতে হবে সকল স্তরের সংগঠনকে-মানুষকে, আর তৃণমূল পর্যায়ের গণমাধ্যমকেও।

লেখক-সম্পাদক, দৈনিক গৌড় বাংলা ও
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফ এম