অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিএনপির তৃণমূল ও অঙ্গ সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠনে স্থবিরতা

79

bnpবিএনপির হাইকমান্ড তৃণমূল কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছে। কারণ দলের প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে অধিকাংশ স্থানেই তৃণমূলের কমিটি পুনর্গঠনে স্থবিরতা বিরাজ করছে। দলের ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৯টির কমিটি ঘোষণা করাহয়েছে। তাছাড়া ঝুলে রয়েছে বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলোর কমিটির পুনর্গঠনও। অভিযোগ উঠেছে দলের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ প্রভাবশালী নেতারা নিজে কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে মরিয়া। এমনকি তৃণমূলের কমিটি গঠন নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগও তুলছেন কেউ কেউ। যদিও কেন্দ্র থেকে প্রভাবশালীদের ওই ধরনের উদ্যোগকে সমর্থন না জানিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির তৃণমূল্য কমিটি পুনর্গঠন ঝুলে পড়েছে। বিএনপির নীতি-নির্ধারণী সূত্রে জানা  এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কমিটি পুর্নগঠন নিয়ে বিএনপি তৃণমূলে দলীয় কোন্দর নিরসনে হিমশিম খাচ্ছে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। বিষয়টি হাইকমান্ডও অবগত আছেন। এই অবস্থায় কোন্দল নিরসনে দলের হাইকমান্ড ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করায় বেঁধে দেয় সময়ের (৩০ নভেম্বর) পুনর্গঠন সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আবারো কমিটি পুনর্গঠনের মেয়াদ আবারো বাড়ানো হতে পারে। যদিও তৃণমূল পুনর্গঠনের পাশাপাশি দলের অঙ্গ সংগঠনগুলোর নতুন কমিটি গঠনেরও কাজ শুরু করেছিল বিএনপির। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যুবদলের সিনিয়র নেতাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে একটি খসড়া কমিটিও চূড়ান্ত করেন। কিন্ত কমিটিতে পদ প্রত্যাশীরা তাতে বাদ সাধেন। চেয়ারপারসন কি পদে রাখলেন সেটাকে গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো তারা নিজেরাই পছন্দের পদ দাবি করে বসেন। আর পদ ভাগাভাগি করতে গিয়েই নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। আর ওই কোন্দলে দলের সিনিয়র নেতারাও ইন্ধন দিতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে কমিটি চূড়ান্ত করার পরও তা ঘোষণা থেকে সরে আসে দলের হাইকমান্ড। উল্টো পদ প্রত্যাশীদের পরোক্ষভাবে সতর্ক করা হয়। যুবদলের নতুন কমিটি ঘোষণা স্থগিত করে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে অ্যালবার্ট পি কস্তাকে। পদ প্রত্যাশীরা তাদের কোন্দল মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত নতুন কমিটি দেয়া হবে না এমন বার্তাও দেয়া হয়েছে। বিষয়টি পদ প্রত্যাশীরাও এখন উপলব্ধি করতে পেরেছেন। ফলে নতুন কমিটি আটকে যাওয়ার পর এখন তারা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, বিগত ওয়ান-ইলেভেনের পর বিএনপি সাংগঠনিকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। ওই অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সেজন্য তৃণমূল পুনর্গঠনে বারবার সময় সীমা বেঁধে দেয়া হয়। আর দ্রুতই পুনর্গঠন কাজ শেষ হবে এমন ঘোষণা একাধিকবার দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের আগষ্ট পর্যন্ত দু’দফা দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত দলটির ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ১৯টির কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।  যদিও চলতি মাসের মধ্যে আরও ২০টি জেলার কমিটি গঠনের টার্গেট নেয়া হয়েছে। মূলত দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা এবং সাবেক সংসদ সদস্যদের নেতিবাচক ভূমিকার কারণেই তৃণমূল পুনর্গঠন কাজ নির্দিষ্ট সময়ে করা সম্ভব হচ্ছে না। বেশিরভাগ জায়গায় তারা হস্তক্ষেপ করছেন। আবার কোথাও কোথাও কেন্দ্রীয় নেতাদের অনীহার কারণেও আটকে আছে জেলা কমিটি পুনর্গঠন। তাদের ব্যাপারে হাইকমান্ডের কাছে কিছু বলাও যাচ্ছে না।
সূত্র আরো জানায়, মানিকগঞ্জে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মঈনুল ইসলাম শান্ত ও জেলার সভাপতি আফরোজা খান রিতার মধ্যে সৃষ্ট দ্বন্দ্বে থমকে আছে কমিটি গঠন। ফেনী জেলা কমিটি নিয়ে বিরোধও চরমে। সেখানে সভাপতি হতে সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন (ভিপি) ও আবু তাহের এবং সাধারণ সম্পাদক পদে সৈয়দ মিজানুর রহমান ও গাজী হাবিব উল্লাহ মানিক সক্রিয় আছেন। সম্প্রতি সব পক্ষকে নিয়ে ঢাকায় বৈঠক ডেকেও পরে সংঘর্ষের শঙ্কায় তা বাতিল করা হয়। লক্ষ্মীপুরে সভাপতি পদে সাহাবুদ্দিনকে (সাবু) চূড়ান্ত করার পর বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঁইয়ার হস্তক্ষেপে তা স্থগিত করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলার সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া তার অনুসারী ছাড়া কাউকে মানতে নারাজ। বরিশাল মহানগর কমিটির গঠনে মজিবুর রহমান সরোয়ার সহযোগিতা করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন নরসিংদী জেলারও সভাপতি। ফজলুল হক মিলন একই সাথে গাজীপুর জেলার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আছেন। তাদের হস্তক্ষেপ এবং অনীহার কারণে ওসব জেলা কমিটি পুনর্গঠন কাজ করা যাচ্ছে না। একই অবস্থা লালমনিরহাটেও। ওই জেলার সভাপতি আসাদুল হাবিব দুলু বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকও। খুলনা মহানগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু কেন্দ্রেরও সাংগঠনিক সম্পাদক। তার কারণে সেখানে কমিটি পুনর্গঠন গতি পাচ্ছে না। তাছাড়া ভোলা জেলার ওয়ার্ড কমিটি থেকে শুরু করে জেলা কমিটি গঠনে হস্তক্ষেপ করছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী কমিটির সদস্য হাফিজ ইব্রাহীম ও নাজিম উদ্দিন আলম। ওই নেতারা তাদের আত্মীয়-স্বজন ও কর্মচারীদের দিয়েই বিগত দিনে জেলার বিভিন্ন কমিটি গঠন করেছে। এখনো তারা ওই ধরনের কমিটি গঠন করতে চাইছেন। সম্প্রতি এসব তথ্য দলের হাইকমান্ডকে জানানো হয়েছে। বরগুনা কমিটি গঠনে হস্তক্ষেপ করছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তাছাড়া রংপুর জেলা ও মহানগর, বগুড়া, পটুয়াখালী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুরসহ বেশ কিছু জেলায় কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের দ্বন্দ্বে কমিটি গঠন করা যাচ্ছে না।
এদিকে যোগ্য নেতার  অভাবে কৃষক দল, তাঁতীদল ও মৎস্যজীবী দলের কমিটি পুনর্গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না। মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর কৃষক দলের সভাপতির দায়িত্ব ছেড়ে দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বর্তমানে কৃষক দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসার মতো নেতার অভাব দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের শীর্ষ নেতৃত্বে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা সাবেক ছাত্রনেতাদের কয়েকজনের সাথে কথাও বলেছেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির তৃণমূল পুনর্গঠনের সমন্বয়ক ও ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, যেসব জেলায় আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে সেখানে খুব শিগগির পরিস্থিতি বিবেচনা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। চলতি মাসেই বেশ কয়েকটি জেলায় কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি গঠন করতে গিয়ে কিছুটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তবে স্থানীয় নেতা ও হাইকমান্ডের সাথে বসে তা নিরসনের চেষ্টা চলছে। নতুন ও পুরাতন সবাইকে নিয়েই ওসব জেলা কমিটি গঠন করা হবে।