‘অনিয়ম’ বিটিসিএলের দরপত্রে

77

03দরপত্রে যোগ্য কোম্পানিকে বাদ দিয়ে তড়্ঘিিড় করে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানির (বিটিসিএল) বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের ঢাকা থেকে কুয়াকাটা সঞ্চালন লাইনের উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন যন্ত্রপাতি স্থাপন কাজে এই অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে একজন দরদাতাকে বাছাই করে মূল্যয়ন কমিটি ওই কোম্পানিকে কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ করলেও বিটিসিএল পর্ষদ সেই দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করে চুক্তি করে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) সঙ্গে। টেশিস আবার এই কাজের জন্য ভারতীয় একটি কোম্পানিকে অংশীদার করেছে।
বিটিসিএল ও টেশিস দুটি সংস্থারই পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরী। দরপত্র বাতিল ও নতুন চুক্তি- দুই ক্ষেত্রেই অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে রাষ্ট্রীয় ক্রয় সংক্রান্ত কারিগরি মূল্যায়ন সংস্থা (সিপিটিইউ)। সংস্থাটির মহাপরিচালক ফারুক হোসেন বলেন, “এরা (বিটিসিএল) যে পদ্ধতিতে কাজটা বাতিল করেছে এবং টেশিসের মাধ্যমে যেভাবে একটা কোম্পানিকে যেভাবে মূল্যায়নে ডেকেছে, এটা বিধিবিধানের সম্পূর্ণ বাইরে।” দরপত্র মূল্যায়নে যোগ্য বিবেচিত হওয়া নেটাস, টার্কির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আহমদ মুশফেক আনাম বলেন, সমস্ত ঘটনা বিশ্লেষণে তারা দেখতে পেয়েছেন, বিটিসিএলের দরপত্র মূল্যায়নে তেমন কোনো সমস্যা নেই। “কিন্তু সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে পরিচালনা পর্ষদ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী দরপত্র বাতিলের জন্য যেসব কারণ থাকা আবশ্যক, সে ধরনের কোনো কারণ না থাকা সত্ত্বেও আইন ও বিধি ভঙ্গ করে দরপত্র বাতিল করে। পাশপাশি আবার আইন ও বিধি ভঙ্গ করে বিনা টেন্ডারে অনভিজ্ঞ কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।”
টেলিযোগাযোগ সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি ‘বিচারাধীন’ থাকার কারণ দেখিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে একটি আবেদনে হাই কোর্ট কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অবৈধ ঘোষণা করে বিটিসিএলের সঙ্গে টেশিসের চুক্তি বাতিল করে নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দিয়েছে। বিষয়টি এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে যুক্ত হতে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা, বেনাপোল ও আখাউড়াসহ বিভিন্ন জায়গার মধ্যে উচ্চ ক্ষমতার (১০০ জিবি) সঞ্চালন যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য গত ২৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহবান করে বিটিসিএল।
তিনটি কোম্পানি দরপ্রস্তাব জমা দেয়। কারিগরি উপ-কমিটি দরপত্র মূল্যায়ন করে ‘নেটাস, টার্কি’ কে একমাত্র ‘টেকনিক্যালি রেসপনসিভ’ ঘোষণা করে। প্রতিষ্ঠানটি সফল দরদাতা হিসেবেও বিবেচিত হয়। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ১৫ সেপ্টেম্বর ‘নেটাস, টার্কি’কে কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ করে প্রস্তাব পাঠায়।কিন্তু ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদ এ প্রস্তাবে অনুমোদন না দিয়ে কালক্ষেপণ শুরু করে।২৭ সেপ্টেম্বর পরিচালনা পর্ষদের সভায় মূল্যায়ন প্রতিবেদন যাচাই করে মতামত দেওয়ার জন্য পর্ষদ সদস্যের তিন জনের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়। অক্টোবরের ১৫ তারিখে পর্ষদ সভায় ওই কমিটি তাদের প্রতিবেদন তুলে ধরেন। এতে মূল্যায়ন কমিটি প্রতিবেদন তৈরিতে ‘অগ্রহণযোগ্য ও দয়িত্বহীনতার’ পরিচয় দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সেইসঙ্গে ক্রয় প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয় বলে তা বাতিলের সুপারিশ করে।
এরপর পরিচালনা পর্ষদ আরও একধাপ এগিয়ে মূল্যায়ন কমিটির কাছে ব্যাখ্যা না চেয়েই পুরো দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। গত ১ নভেম্বর এক চিঠির মাধ্যমে তা জানানো হয়। এদিকে ২৭ এপ্রিল থেকে দরপত্র প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই ভারতীয় একটি কোম্পানির সঙ্গে টেশিসের ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ দেখিয়ে তাদেরকে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মো. ফয়জুর রহমান চৌধুরী ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মো. ফয়জুর রহমান চৌধুরী এরপর ৯ নভেম্বর অভিযোগ দায়ের করে নেটাস। দেশের ক্রয় আইন ও বিধি অনুযায়ী অভিযোগ দেওয়ার পর তার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্য কাউকে কার্যাদেশ দেওয়া না গেলেও ১৫ নভেম্বর বিটিসিএল পরিচালনা পর্ষদ টেশিসকে কাজ দিয়ে দেয়। টেশিস মে মাসে দরপত্রের বাইরে গিয়ে তেজাস, ইন্ডিয়া নামে ওই কোম্পানির কাছ থেকে বিটিসিএলের চাহিদা অনুযায়ী যন্ত্রপাতি সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। জুলাই মাসে ওই প্রস্তাব সংশোধন করে পুনরায় পাঠানো হয়।
দরপত্রে বলা হয়েছিল ১০০ জিবি ক্ষমতার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে হবে। তেজাস, ইন্ডিয়া ওই যন্ত্রপাতি তৈরি করে বলে টেশিস ‘ভুল’ তথ্য দেয়। আর তা প্রমাণ করতে গিয়ে তেজাস ‘ঈরবহধ, টঝঅ’ এর জন্য এ ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি করে বলে দাবি করে। ‘ঈরবহধ, টঝঅ’-এর ১০০ জিবি ক্ষমতার যন্ত্রপাতি যে তেজাস তৈরি করে না এবং কখনোই করেনি তা ‘ঈরবহধ, টঝঅ’ একটি চিঠি থেকে জানা যায়।
কিন্তু টেশিসের মাধ্যমে তেজাসকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার আগ্রহের আরেকটি ঘটনাও প্রকাশ পায়। দরপত্রের বাইরে টেশিসের প্রস্তাব বিবেচনার সময় অগাস্ট মাসে সচিব ফয়জুর রহমান চৌধুরী ভারতে তেজাসের কারখানা পরিদর্শনে যান। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বেঙ্গালুরুতে কোম্পানিটি পরিদর্শনে যান উচ্চপদস্থ তিন কর্মকর্তা। এরা হলেন-বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার হোসেন, বিটিসিএলের তখনকার ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবীর হোসেন ভূঁইয়া এবং টেশিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবির হাসান। ভ্রমণ থেকে ফিরে টেশিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তেজাসের প্রশংসা করে সচিবকে একটি চিঠি লেখেন, যেখানে কোম্পানিটির ১০০ জিবি ক্ষমতার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার তথ্য তুলে ধরা হয়। একইসঙ্গে তেজাসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, সাবমেরিন কেবলের দ্বিতীয় স্টেশন ‘ন্যুনতম’ সময়ে স্থাপনে তেজাস আশাব্যঞ্জক উত্তর দেয় এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ সম্পর্কে ‘নিশ্চয়তা’ প্রদান করে। এরপরই শুরু হয় শুরু হয় উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে সরাসরি কার্যাদেশ দেওয়ার কাজ। ১০ নভেম্বর থেকে মাত্র চার কার্যদিবসে সমস্ত দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করে টেশিসকে কার্যাদেশ দিয়ে চুক্তি করে বিটিসিএল। দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে সিপিটিউ-এর মহাপরিচালক ফারুক হোসেন বলেন, “যখন একটা ওপেন টেন্ডার চলছে তখন পাশাপাশি অন্য কাউকে ডাকা যায় না। কারণ এটা নিয়ে কম্পিটিশন চলছে। কম্পিটিশনের সময় অন্যকে ডাকা যায় না-বিধি অনুযায়ী এটা গ্রহণযোগ নয়।” রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি টেশিস এ ধরনের কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত নয় বলেও মনে করেন সিপিটিইউয়ের মহাপরিচালক। “যে কাজটির জন্য তারা সরাসরি টেশিসের সঙ্গে নেগাশিয়েশন শুরু করেছে, টেশিস এই কাজের এজেন্সি নয়। বিধি অনুযায়ী, সরকারি সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে থেকেই সেই পণ্য কেনা যাবে যদি সেটা তার উৎপাদিত হয়। কিন্তু সে মধ্যপন্থি হতে পারবে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দালালি করার কোনো সুযোগ নেই।” ফারুক হোসেন বলেন, “জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার জন্য এই সুযোগ। কিন্তু এটার মানে এই নয় যে, এই প্রতিষ্ঠান আরেকজনের কাছ থেকে জিনিস কিনে এনে আরেক জায়গায় সরবরাহ করে মিডলম্যান হিসেবে লাভ করবে।”
দরপত্র প্রক্রিয়া চলার সময় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির অর্থে বিদেশ ভ্রমণ ও অতিথেয়তা গ্রহণও যে বিধিভঙ্গ, তা সিপিটিইউয়ের এক ব্যাখায় জানানো হয়েছে।