অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা রোধে তৎপর গভর্নিং বডি, শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজ-১

191

নিয়ম না থাকায় ২০১৯ সালে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সম্মানি ভাতা বন্ধ করে দেন গভর্নিং বডির তৎকালীন সভাপতি জেলা প্রশাসক

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহরের প্রাণকেন্দ্র বিশ্বরোড মোড়ে ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজ। বর্তমানে কলেজটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। এর মধ্যে অনার্স কোর্সে শিক্ষার্থী রয়েছেন প্রায় দেড় হাজার।
প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে শিক্ষক কর্মচারীর সংখ্যা ৮৪ জন। এর মধ্যে ৫৯ জনই এমপিওভুক্ত। এদের মধ্যে অনার্সের জন্য ২৫ জন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এসব শিক্ষকের বেতন-ভাতাদি দেয়া হয় অনার্স শিক্ষার্থীদের বেতনসহ অন্যান্য ফি থেকেই। শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ হতে পর্যায়ক্রমে অনার্স কোর্স চালু হয়। বর্তমানে ৬টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। বিষয়গুলো হলোÑ বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, সমাজকর্ম, ব্যবস্থাপনা ও মার্কেটিং।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার দরুন প্রশাসনিক কাজকর্মে বিঘœ ঘটছিল। এসব বন্ধে তৎপর হয়েছে বর্তমান গভর্নিং বডি। এরই মধ্যে আর্থিক অনিয়ম ও কলেজের বিশৃঙ্খলা দূর করতে শিক্ষকদের সমন্বয়ে বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজের তদারকিসহ আয়-ব্যয়ের হিসাব করতে হবে সংশ্লিষ্ট উপ-কমিটিগুলোকে। সব উপ-কমিটি শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত হলেও শুধু প্রজেক্ট কমিটিতে গভর্নিং বডির একজন সদস্য রয়েছেন।
জানা গেছে, এই তৎপরতা শুরুর পেছনে বর্তমান সভাপতি বালুগ্রাম আদর্শ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সাইদুর রহমানের অভিজ্ঞতা ও গভর্নিং বডির সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। ২০২০ সালের ১১ আগস্ট সাইদুর রহমান কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনীত হন। আর দুই বছর মেয়াদে নতুন গভর্নিং বডি গঠন হয় ২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি। গভর্নিং বডির অন্য সদস্যরা হলেনÑ প্রফেসর সুলতানা রাজিয়া, মেসবাহুল শাকের জ্যোতি, বাবর আলী, হাসিব হোসেন, ডা. দুররুল হোদা, কামরুল আরেফিন বুলু; তিনজন অভিভাবক সদস্য হলেনÑ ডা. গোলাম রাব্বানী, মনোয়ারুল ইসলাম ও গোলাম কিবরিয়া কোয়েল মিয়া এবং তিনজন শিক্ষক প্রতিনিধি হলেনÑ আরবি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কামরুজ্জামান, ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাসুমা হক ও সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহজামাল। এছাড়া বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ গভর্নিং বডিতে পদাধিকার বলে সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন।
এই বিদ্যাপীঠকে সামনে এগিয়ে নিতে গভর্নিং বডি উদ্যোগী হয়। এরই মধ্যে সীমানা প্রাচীর ছাড়াও কলেজ মিলনায়তনের সংস্কার এবং ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হয়। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মনোরম পরিবেশে বসার জন্য ক্যাম্পাসে থাকা আমগাছের গোড়াগুলো বাঁধাই করা হয়। সংস্কার করা হয় গ্যারেজ ও ফুলবাগানের। বিজ্ঞান ভবন ও মার্কেট সংস্কারের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে কলেজ সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, কলেজের আয়ের একটি খাত হলো শাহ নেয়ামত উল্লাহ মার্কেট। দোতলা এই মার্কেটটির কোনো কোনো দোকানের ভাড়া বকেয়া রয়েছে ১০৮ মাস ধরে। যে ভাড়া তোলার জন্য এর আগে সেভাবে তাগিদ দেয়া হয়নি বলে জানা যায়। তাছাড়া প্রতি পাঁচ বছর পর দোকান ভাড়া বর্ধিত করার কথা থাকলেও ভাড়া আজও ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় রয়ে গেছে। যে কারণে বাড়তি ভাড়া ও মিউটেশন ফি হতে কলেজ এ যাবৎ বঞ্চিত হয়েছে। এই সমস্যা দূর করতে মার্কেট বিষয়ক একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারের ডিজিটালাইজডের অংশ হিসেবে এবং আর্থিক অনিয়ম রোধে ওয়েবসাইট ও এডুকেশন সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার তৈরিতে বর্তমান গভর্নিং বডি কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষে আইটি ফার্ম নিযুক্ত করা হয়েছে এবং এরই মধ্যে কলেজের পেমেন্ট সিস্টেম সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজডের আওতায় আনা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২০ এপ্রিল বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে অধ্যক্ষের কক্ষে অবস্থান কর্মসূচি করে শিক্ষক-কর্মচারীরা। অনার্স বিভাগের শিক্ষকদের ৪-৬ মাসের বেতন বন্ধ থাকায় এবং কলেজের সকল শিক্ষক ও কর্মচারীর বোনাসের দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
এ বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে অন্য চিত্র। জানা যায়, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়কালে অনার্স কোর্স থেকে প্রাপ্ত আয়ের বড় অংশই নিয়ম বহির্ভূতভাবে ‘সম্মানি ভাতা’র নামে উত্তোলন করেছেন অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, বিভাগীয় প্রধানসহ শিক্ষক-কর্মচারীরা। উত্তোলনকৃত এই টাকার পরিমাণ ১ কোটি ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৩১৬ বলে জানা গেছে। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সম্মানি হিসেবে নিয়েছেন ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার ১২ টাকা এবং কর্মচারীরা নিয়েছেন ১৫ লাখ ৫৪ হাজার ৩০৪ টাকা। বিধিমালায় না থাকলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বেআইনিভাবে সম্মানি ভাতার নামে টাকা উত্তোলন করেছেন। তবে সম্মানি ভাতা অনার্স বিষয় সংশ্লিষ্ট অন্য শিক্ষকরা (এমপিওভুক্ত) নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন কেউ কেউ।
অফিস সহকারী শফিকুল ইসলাম চাকরি করছেন ১৯৯৩ সাল থেকে। তিনি জানান, অনার্স কোর্স চালুর পর প্রথম দিকে তিনি বাৎসরিক ৫ হাজার টাকা করে পেয়েছেন। পরে পেয়েছেন ১০ হাজার টাকা করে। এখন এটা বন্ধ আছে। তিনি পুনরায় এ টাকা দেয়ার দাবি জানান।
বকেয়া বেতন-ভাতা প্রসঙ্গে কথা হয় অনার্স কোর্সের একজন শিক্ষক আবদুল কাদেরের সঙ্গে। ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনার্স চালুর সময় থেকে তিনি শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত আছেন। তার ৫ মাসের বেতন বকেয়া আছে বলে জানান। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সম্মানি ভাতা নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথম দিকে রেজ্যুলেশন করে এই ভাতা প্রদান করা হয়নি। এই শিক্ষক মনে করেন, সম্মানি ভাতা না দেয়া হলে আজ অনার্স শিক্ষকদের বেতন সংকট হতো না।
তবে এই সম্মানি ভাতা যথাযথভাবে প্রদান করা হয়নি এবং অনার্স শিক্ষকরা এর প্রতিবাদও করেছিলেন বলে জানা যায়। এও জানা গেছে, নিয়ম না থাকায় ২০১৯ সালে গভর্নিং বডির তৎকালীন সভাপতি জেলা প্রশাসক এ সম্মানি ভাতা প্রদান বন্ধ করে দেন।
গভর্নিং বডির সদস্য বাবর আলী জানান, “কলেজে দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা অনিয়ম দূর করতে গিয়েই বর্তমান কমিটি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। কেননা বর্তমান গভর্নিং বডি কলেজের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা রোধে তৎপর হয়েছে এবং এ লক্ষে কাজও শুরু করেছে। এসব কাজে কেউ কেউ নাখোশ হওয়ায় কমিটির নামে অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা।” তিনি বলেন, “এই কলেজের গভর্নিং বডিতে যারা রয়েছেন, আমার মনে হয় না যে, আর কোনো কমিটিতে এরকম সম্মানিত মানুষ রয়েছেন।”
বাবর আলী আরো বলেন, “সম্মানি ভাতার নামে অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী অনার্স ক্যাটাগরি থেকে প্রাপ্ত আয় অনিয়মতান্ত্রিকভাবে উত্তোলন করেছেন, যা অর্থ আত্মসাতের শামিল বলে মনে হয়। ২০১৯ সালে গভর্নিং বডির তৎকালীন সভাপতি মাননীয় জেলা প্রশাসক এ সম্মানি ভাতা বন্ধ করে দেন। তিনি আরো জানান, “সম্মানি ভাতার নামে বিধিবহির্ভূতভাবে টাকা উত্তোলন না করলে আজ অনার্স শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সংকট তৈরি হতো না। কেননা বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রায় দুই বছর বন্ধ ছিল এবং ওই সময়ে শুধু অনার্স শিক্ষার্থীই নয়, অন্যদের কাছ থেকেও বেতন নেয়া সম্ভব হয়নি।” তিনি এও জানান, ঈদের আগে আংশিক বকেয়া বেতন প্রদান করা হয়েছে।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হাকিকুল ইসলাম জানান, কলেজের যা কিছু হয় রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে হয়। অনার্স কোর্সের শিক্ষকদের বকেয়া বেতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, করোনাকালে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি নিতে না পারায় বেতন বকেয়া হয়েছে। বকেয়া বেতন ধীরে ধীরে দেয়া হচ্ছে। ঈদের আগে আংশিক পরিশোধ করা হয়েছে। কলেজের সব কার্যক্রম ডিজিটালাইজড করার চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান। সম্মানি ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১৯ সালে গভর্নিং বডির তৎকালীন সভাপতি জেলা প্রশাসক মহোদয় এটি বন্ধ করে দেন এবং এখনো বন্ধ রয়েছে।
সরেজমিন কলেজের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, আগে যারা দায়িত্বে ছিলেন তারাই সম্মানি ভাতা চালু করেছিলেন। নিয়মের মধ্যে দেয়া হয়েছিল কিনা তা তারা যাচাই করে দেখেননি।
তবে কলেজের হিতাকাক্সক্ষীরা বলছেন, একজন দক্ষ অধ্যক্ষের অভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। একটি কলেজকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে দক্ষ অধ্যক্ষের কোনো বিকল্প নেই। একজন দক্ষ অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া গেলেই অনেকাংশেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে তারা মনে করছেন।

[আগামীতে দ্বিতীয় পর্ব]