অতিউৎসাহী অভিভাবকের কারণে করোনা হুমকিতে শিক্ষার্থীরা

90
মোহা. মোস্তাক হোসেন

করোনা ভাইরাস বিশ্ববাসীকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রেখেছে। করোনার ভয়ঙ্কর আগ্রাসনে বিশ্ব চিকিৎসা বিজ্ঞান নিরুপায়। চিকিৎসা বিজ্ঞান একের পর এক পরীক্ষামূলক ওষুধ প্রয়োগ করে বিশ্বদরবারে আশার আলো দেখালেও তা পুরো স্বস্তি দিতে পারছে না। অপরদিকে দিনদিন মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থায় সবাই জর্জরিত। সবাই চিন্তিত, কিভাবে হবে বা কি তার প্রতিকার। এক্ষেত্রে শিশুদের চিন্তাও কম নয়।
শহর থেকে দূরের এলাকায় বসবাসরত শিশু ঘরবন্দি দশা থেকে খানিকটা গা-ছাড়াভাবে চলাফেরা করে থাকে। কিন্তু শহরকেন্দ্রিক শিশু একেবারে ঘরবন্দি। তারা চার দেয়ালের মাঝে বদ্ধ। বন্দিদশার কারণে মনে বিষণœতার দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সেই বিষণ তায় সৃষ্ট দুশ্চিন্তা তাদেরকে মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলতে পারে। তাদের মনে সব সময় ভয় কাজ করছে। তারা ধারণা করছে, আদৌ কি করোনার অপ্রতিরোধ্যতাকে জয় করতে পারা যাবে? অথবা জয় করতে পারলেও তা কতদিন লাগবে? তাদের মনে এ ধরনের ভীতি সঞ্চিত হতে থাকলে, তারা রোগ প্রতিরোধ শক্তি হারাতে থাকবে।
কিশোর, তরুণ ও যুবকদের চলাফেরায় দেখা যাচ্ছে ঈদুল ফিতর পরবর্তী সময়ের অবস্থা ঈদ-পূর্ববর্তীর বিপরীত। তাদের চলাফেরা একেবারেই ফ্রি-স্টাইল ভাব। এই মুহূর্তে সবার যে চলাফেরা, তা দেখে মনে হচ্ছে ‘করোনা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট মহামারি’ একটি সাধারণ ফ্লু। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা যাচ্ছে। শিশু-কিশোর অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে অন্যান্য সেক্টর সীমিত আকারে খোলা রাখার বিষয়ে সরকারের পক্ষ হতে বলা হয়েছে। যেন দেশের জনগণ আর্থসামাজিকভাবে পরিবার নিয়ে এই সংকটকালে টিকে থাকতে পারে।
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, যেহেতু এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন বের হয়নি, সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের দেয়া নির্দেশনা মেনে চলা আবশ্যক। এর ব্যত্যয় করা উচিত নয়। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যেতে হচ্ছে বা হবে। তবে বাইরে বের হবার সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ আগের চেয়ে বর্তমানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি এবং ভয়ের বিষয় হলো এখনকার বেশিরভাগই উপসর্গ ছাড়াই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। আবার তাদের নমুনা ল্যাবে পাঠানোর পর পরীক্ষার ফলাফল পেতে কয়েকদিন সময় অতিক্রম হচ্ছে। এর ফলে যিনি নমুনা পরীক্ষা করতে দিয়েছেন, তিনি ফলাফলের আগে নিদ্বির্ধায় সতর্কতা ছাড়ায় বিভিন্ন স্থানে চলাফেরা করছেন। পরে জানা যাচ্ছে তিনি করোনা পজিটিভ। তাই কার্যত আমরা এক ভয়ানক পরিস্থিতিতে আছি। এই অবস্থায় করোনা প্রতিরোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই, যা দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিনই বলে চলছেন।
বৈশ্বিক মহামারি করোনায় দেশে প্রথম আক্রান্তের খবর পাওয়া যায় গত ৮ মার্চ। এরপর গত ১৭ মার্চ হতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারলেও পাঠদানের সময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হবে না। কোনো একজন আক্রান্ত হলে প্রতিষ্ঠানের অন্যদের মধ্যে দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সেই আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা শিক্ষার্থীর মাধ্যমে তাদের পরিবারেও বিস্তার ঘটতে পারে। বর্তমানে দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বর্ধিত করেছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে। আবার শিক্ষার্থীদের পাঠবিমুখতা রোধে রাষ্ট্রীয়ভাবে টেলিভিশনের মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম চালু আছে। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে শিক্ষার্থীর পাঠঅভ্যাস চলমান রাখতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেছে। এছাড়াও বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার লেখাপড়া বিভাগ হতে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হচ্ছে। আবার ইউটিউব হতে টিউটেরিয়ালের মাধ্যমে পাঠঅভ্যাস সচল রেখেছে অনেক শিক্ষার্থী। অনেক শিক্ষকই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, সীমিত আকারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে পারলে হয়তো শিক্ষার্থীদের পাঠঅভ্যাসের ওপর তদারকি করা যেত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসতে হলে জনবহুল পথ দিয়ে আসতে হবে। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। তাই শিক্ষার্থীদের সবদিক বিবেচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ২৭ এপ্রিল বলেছিলেন, ‘সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্কুল-কলেজসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।’
১৫ জুন সাধারণ ছুটি পেরিয়ে যাওয়ায় আবারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নতুন বর্ধিত ছুটির আদেশ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ১৭ জুন প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ই-মেইল পাঠিয়েছে। মেইলে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীর সুরক্ষার জন্য সকল ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকবে এবং শিক্ষার্থীরা নিজেদের ও অন্যদের করোনা সংক্রমণ হতে রক্ষার জন্য নিজ বাসস্থানে অবস্থানের বিষয়টি অভিভাবক নিশ্চিত করবেন।
অপরপক্ষে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে পাঠগ্রহণ থেকে দূরে থাকার জন্য সিলেবাস কমানোর চিন্তাভাবনা করছেন শিক্ষাপ্রশাসন ও শিক্ষাবিদরা। কিন্তু অতিউৎসাহী অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট টিউশনে পাঠাচ্ছেন। অভিভাবকগণ বুঝছেন না যে, তাদের সন্তানরা কিভাবে প্রাইভেট টিউটেরিয়াল সেন্টারে যাচ্ছে এবং সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানার পরিবেশ আছে কিনা। পরিবেশ থাকবেই বা কেমন করে, একটি ঘরে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সমাগম হয়। এই পরিস্থিতিতে একজন করোনা আক্রান্ত থাকলে বা হলে সেই সকল শিক্ষার্থীর পরিবার আক্রান্ত হওয়ার যথেষ্টই সম্ভাবনা থাকে। অভিভাবকের উচিত, বর্তমান পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নেয়া। তাদের অতিউৎসাহী হওয়ার কারণে পরিবারে নেমে আসতে পারে চরম পরিস্থিতি। তাই সময় থাকতে অভিভাবকরা সচেতন হবেন এবং নিজের সন্তানদের সুস্থ রাখার চেষ্টা করবেনÑ এটাই প্রত্যাশা।

মোহা. মোস্তাক হোসেন : লেখক ও শিক্ষক, আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ